শিরক কেন সবচেয়ে বড় গুনাহ?
Why Shirk is so evil?
১. তাওহিদ
যদি এক কথায় ইসলাম কি তা বলতে হয় তবে বলতে হবে ইসলাম হলো 'তাওহিদ' একত্ববাদ। আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয় এটাই ইসলাম। আজ পর্যন্ত যত নবী রাসুল এসেছেন তাঁদের রিসালাতের মূল বাণী ছিল 'লা ইলাহাইল্লাল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। রিসালাতের ক্ষেত্রে কালেমার দ্বিতীয় অংশ হয়তো নবীগণের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে যেমন ঈসা (আ) এর রিসালাতের বাণী ছিলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ঈসা রুহুল্লাহ ' অর্থাৎ যুগে যুগে নবীদের কওম কালেমার শেষে উক্ত নবীর নাম সহ কালেমা পড়লেও মূল কালেমা কিন্তু একই তা হলো আল্লাহর একত্ববাদ। তিনি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরীক নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে স্পষ্টভাবে তাঁর সত্তার পরিচয় দিয়েছেন,
"বলুন ( হে নবি ), তিনি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় ,
২. তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন ,
৩. তিনি কাউকে জন্ম দেননি ; কেউ তাঁকে জন্ম দেননি,
৪. আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই ।" (সুরা ইখলাস: ১-৪)
আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয় এটি কুরআন থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। মুমিনগণের জন্য কুরআনই যথেষ্ট এমনকি আমাদের ফিতরাত ও এটাই স্বীকার করে যে আল্লাহ কেবল একজনই। আমরা নিম্নোক্ত যুক্তি তথা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি প্রমাণ করব তাওহিদ ই সঠিক এবং যৌক্তিক।
১. বর্জন নীতিঃ এই যুক্ত অনুসারে একের অধিক স্রষ্টা থাকা অসম্ভব, যেহেতু একমাত্র একজনের ই ইচ্ছেশক্তি থাকবে। একজন স্রষ্টার অবশ্যম্ভাবী ভাবে ইচ্ছে শক্তি থাকতে হবে। তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নেই যে দুজন ঈশ্বর আছেন। স্রষ্টা A এবং স্রষ্টা B দুজনেই একটা পাথর সরাতে চাচ্ছেন। এখানে তিন ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
১. একজন সৃষ্টিকর্তা অন্যজনের থেকে বেশি শক্তিশালী হয়ে পাথর টি সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে।
২. দুজনের ইচ্ছে শক্তিই বাতিল হয়ে যাবে কেউই পাথর সরাতে সক্ষম হবে না।
৩. দুজনেই একই দিকে পাথর সরাবেন।
প্রথম দৃশ্যপট অনুযায়ী একজনের ইচ্ছে শক্তি অনুযায়ী কার্য সম্পাদন হবে সুতরাং তিনিই ঈশ্বর এবং অন্যজন ঈশ্বর নন। দ্বিতীয় দৃশ্যপট অনুযায়ী দুজনের ইচ্ছেশক্তি তে কোনো কাজ হয়নি সংজ্ঞানুযায়ী এটা অসম্ভব। তৃতীয় দৃশ্যপট অনুযায়ী একজনের ইচ্ছেশক্তি পূর্ন হয়েছে সুতরাং ঈশ্বর কেবলমাত্র একজনই।
২. ধারনাগত পার্থক্যঃ যদি দুইজন স্রষ্টা থাকে তবে তাদের মধ্যে অবশ্যই কিছু পার্থক্য থাকবে। পার্থক্য থাকলেই না আমরা কোনো কিছু কে অন্য একটি বিষয় থেকে আলাদা করতে পারি। উদাহরণস্বরুপ, ধরুন দুটো গাছ আছে। সেক্ষেত্রে দুটো গাছের আকার, আকৃতি, রং ইত্যাদির পার্থক্য অবশ্যই থাকবে যার দরুন আপনি বুঝতে পারবেন যে গাছ দুটো আসলে আলাদা। এমনকি যদি গাছ দুটো আইডেন্টিক্যাল ও হয় তবুও এর কিছু পার্থক্য থাকবে। যমজ বাচ্চাদেএ ক্ষেত্রেও ৯৯% মিল থাকলেও কিছু পার্থক্য থাকবেই যার ফলে আমরা তাদের আলাদা করতে পারব। এবার একই বিষয়টি স্রষ্টার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাক। ধরুন X একজন স্রষ্টা এবং Y আরেকজন স্রষ্টা। এখন Y হচ্ছেন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, এবং X নিজেও সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ। তাহলে ঈশ্বর আসলে কয়জন? একজন কেননা এখানে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই স্রষ্টা একজন তাকে একই গুণ একই এসেন্স এর ভিত্তিতে আলাদা করার চেষ্টা টা শুধুমাত্রই শিশুসুলভ চিন্তাভাবনা। ঈশ্বর একাধিক এটা প্রমাণে অবশ্যই তাদের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
৩. ঈশ্বরের সংজ্ঞা থেকে যুক্তিঃ একাধিক স্রষ্টা থাকলে মহাবিশ্ব বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। আমরা মহাজগতের মধ্যে যে ক্রম খুঁজে পাই তাও সেখানে থাকবে না। কোরানের অনুরূপ যুক্তি রয়েছে: "আসমান ও যমীনের মধ্যে যদি আল্লাহ ব্যতীত উপাস্য থাকত, তবে তারা উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।" (১)
তাফসির আল-জালালাইন নামে পরিচিত শাস্ত্রীয় ভাষ্যটি বলে: " একাধিক ইলাহ থাকলে আকাশ ও পৃথিবী তাদের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলত কারণ সেখানে অনিবার্যভাবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ হত, যেমনটি স্বাভাবিক যখন অনেক শাসক থাকে: তারা একে অপরের বিরোধিতা করে এবং একমত হয় না। একে অপরের সাথে।" (২)
যাইহোক, কেউ উল্লেখ করতে পারে যে যেহেতু একাধিক ব্যক্তি আপনার গাড়ি তৈরি করেছেন - একজন ব্যক্তি চাকা লাগিয়েছেন, এবং অন্য কেউ ইঞ্জিন ইনস্টল করেছেন এবং অন্য কেউ কম্পিউটার সিস্টেম ইনস্টল করেছেন - সম্ভবত মহাবিশ্ব একইভাবে তৈরি হয়েছিল। এই উদাহরণটি নির্দেশ করে যে একটি জটিল বস্তু একাধিক সৃষ্টিকর্তা দ্বারা তৈরি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এই যুক্তির উদ্দেশে প্রথমত যা দেখা দরকার তা হচ্ছে ঈশ্বর এর ইচ্ছেশক্তির কোনো সীমা নেই তবে গাড়ি প্রস্তুতকারক এর সীমা রয়েছে। সেক্ষেত্রে গাড়ি প্রস্তুতকারক এর এনালজি একজন ঈশ্বরের ক্ষেত্রে ফলস এনালজি হয়ে থাকে। এখন সংজ্ঞানুযায়ী ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, অসীম সত্তা, সেক্ষেত্রে এর দ্বিতীয় কিছু থাকার কোনো অবকাশ নেই। উদাহরণস্বরুপ ধরুন দুজন স্রষ্টা অসীম শক্তির অধিকারী সেক্ষেত্রে যদি তারা লড়াই করে তবে বেশ কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। হয় একজন অন্যজন কে হারিয়ে দিবে, কেউই কাউকে হারাতে পারবে না, দুজনই হেরে যাবে। এখানে যদি একজন অন্যজন কে হারিয়ে দেয় তবে হেরে যাওয়া ঈশ্বর সংজ্ঞানুযায়ী আর ঈশ্বর থাকেন না এবং যদি কেউ কাউকে না হারাতে পারে তবে তাদের শক্তি কোনো act তৈরি করতে পারছে না যা ঈশ্বরের ক্ষেত্রে অসম্ভব। আবার যদি তারা দুজনই হেরে যায় তবে কেউই আর ঈশ্বর থাকবেন না। সহজ কথায় অসীম ঈশ্বর তার বাহ্যিক কোনো অংশ দ্বারা সসীম নন তাই ঈশ্বর কেবলমাত্র একজনই হতে পারেন।
শিরক:
শিরক অর্থ অংশীদারিত্ব। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সত্তা, গুণাবলীর সাথে কাউকে তুলনা করা কিংবা সমকক্ষ মনে করাই হলো শিরক। শিরক সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিকৃষ্টতম গুনাহ। কেননা এটি নিজস্ব ফিতরাত কে ধ্বংস করে দেয়, মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে অতিক্ষুদ্র সৃষ্টির তুলনা করার মাধ্যমে তাঁর প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। আমরা মাঝেমধ্যে গুনাহের ভার সঠিকভাবে বুঝতে পারিনা।
শিরক হলো চরম পর্যায়ের অবিচার৷ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের পালন করেন, বিনা শর্তে অসীম নেয়ামত দান করেছেন, রুহে স্বাধীনতা দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ, অসংখ্য নেয়ামতের মাধ্যমে আমাদের জীবিত রেখেছেন সেই সর্বাধিক মহান সত্ত্বার সাথে তাঁর ই অতিক্ষুদ্র সৃষ্টির তুলনা চিন্তাও করা যায় না। যার কোনো তুলনাই হয়না, যার থেকে মহৎ কিছু চিন্তাই করা যায় না, যিনি আমাদের অস্তিত্ব আমাদের জগতের অস্তিত্বের মালিক, অস্তিত্বকে ' অস্তিত্বে' আনয়নকারী সর্বশক্তিমান স্রষ্টা তাঁর সাথে অন্য যেকোনো কিছুর তুলনা চরম অকৃতজ্ঞ এবং নিকৃষ্ট পর্যায়ের অবিচার। অন্যদিকে শিরক হচ্ছে চরম পর্যায়ের অজ্ঞতা, মুর্খতা। আল্লাহর সাথে কোনো কিছুর তুলনার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের চরম পর্যায়ের অজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেয়, আল্লাহ যে এক ও অদ্বিতীয়, এটি আমাদের ফিতরাতের বিষয়, এটি আক্বলের বিষয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের কুরআনের মাধ্যমে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি কি করতে পারেন সে সম্পর্কে জানিয়েছেন, এতোকিছু, এতো নিদর্শন থাকার পরেও আল্লাহ তায়ালার সাথে কোনো কিছুর তুলনা করা সর্বোচ্চ অজ্ঞতা। শিরক কেবলই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় কেননা যারা অন্য কিছুকে ঈশ্বর মনে করে তারা সহসাই সকল প্রকার খারাপ কাজ করতে পারে কেননা তাদের দৃষ্টিতে তাদের বানানো ঈশ্বর সর্বশক্তিমান নয় এবং নয় বলেই এতো এতো ঈশ্বরের প্রয়োজন।
একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছে সকল জ্ঞান, শক্তি, ক্ষমতার আধার, তিনি সর্বাধিক মহান সত্তা। তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য। তাঁর সাথে অন্য কারো তুলনা করার অর্থ হলো তাঁর সৃষ্টিকে তাঁর থেকেও বেশি শক্তিশালী, জ্ঞানবান দাবি করা ( নাউজুবিল্লাহ) একজন মানুষ কতটা অজ্ঞ হলে, কতটা মস্তিষ্কহীন হলে একমাত্র স্রষ্টার সৃষ্টিকে সেই স্রষ্টার সমতুল্য মনে করে থাকে। এটি সন্দেহাতীত ভাবে নিকৃষ্টতম জুলুম, অবিচার এবং অজ্ঞতা।
রেফারেন্স:
1.The Qur’an, Chapter 21, Verse 22.
2. Al-Mahalli, J. and As-Suyuti, J. (2007). Tafsir Al-Jalalayn. Translated by Aisha Bewley. London: Dar Al Taqwa, p. 690; Mahali, J. and As-Suyuti J. (2001) Tafsir al-Jalalayn. 3rd Edition. Cairo: Dar al-Hadith, p. 422.
.jpeg)
Comments
Post a Comment