সমকামিতার ব্যবচ্ছেদ: বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক আলোকপাত পর্ব: ২
সমকামিতা এবং রুপান্তরকামিতা নিয়ে প্রথম পর্বে আমরা সমকামিতার সো কল্ড জিনগত কারণ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ জিনগত পর্যায়ের আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করব।
![]() |
| own creation |
জীবের প্রতিটি কোষে Deoxyribonucleic acid বা DNA নামে একটি অণু থাকে, আর এই অনুগুলি একটি জীব কোষের গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্যগুলি ধারন করে। Adenine (A), cytosine (C), guanine (G), and thymine (T) নামের চারটি নিউক্লিওটাইড বেস (nucleotide bases) বিভিন্ন ক্রমে পর পর রৈখিকভাবে সজ্জিত হয়ে এই DNA গঠন করে। [1]
এই যে বিভিন্ন সজ্জাক্রম, একেই DNA sequence বা ক্রম বলে, আর এই সজ্জাক্রম জীবের প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্য নির্ধারণ করে। তবে গোটা DNA জুড়েই যে তথ্য থাকে এরকম নয়, যে অংশগুলিতে তথ্য থাকে সেইগুলির নাম gene বা জিন। এই জিনগুলি এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হয়। [2] কোষের মধ্যে দুটি প্রধান অংশ, একটি নিউক্লিয়াস অন্যটি সাইটোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বিভিন্ন পর্দা দ্বারা বেষ্টিত অঙ্গানু থাকে। আর নিউক্লিয়াসের মধ্যে বংশগতির ধারক ও বাহক DNA থাকে। কিন্তু সব জীবের ক্ষেত্রে এক রকম নয়। অনেক এককোষী জীবের ক্ষেত্রে সুগঠিত নিউক্লিয়াস ( অর্থাৎ নিউক্লিক বস্তু নিউক্লিয়ার মেমব্রেন দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে না) ও বাকি অঙ্গানুগুলি থাকে না। তাদের prokaryote বা আদি কোষ বলা হয়। আর যাদের নিউক্লিয়াস সুগঠিত থাকে তাদের eukaryote বা প্রকৃত কোষ বলা হয়। প্রকৃত কোষের মধ্যে বংশগতির ধারক ও বাহক DNA একটি পর্দা বেষ্টিত অঙ্গানু নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ক্রোমোসোমের মধ্যে সজ্জিত থাকে। DNA অনু আর কিছু নিউক্লিয়ার প্রোটিন (histone) মিলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটি সুসংগঠিত ঘন গঠন তৈরি করে, এদের বলে Chromatin বা ক্রোমাটিন। ক্রোমাটিনগুলি আরও খানিক ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোসোম তৈরি করে। কোষ বিভাজনের সময় এই প্যাঁচানো আকার সরলীকৃত হতে থাকে, তখন মাইক্রোস্কোপের নীচে ক্রোমাটিন দেখতে অনেকটা পুঁতির মালার মতো দেখায়। ইউক্রোমাটিন বা কম ঘনীভূত ক্রোমাটিন থেকে প্রোটিন তৈরির সঙ্কেত বাহিত হয় কিন্তু হেটেরোক্রোমাটিন বা অত্যন্ত ঘনীভূত ক্রোমাটিন থেকে প্রোটিন তৈরির সঙ্কেত বাহিত হয় না। একটি জীবের মধ্যে সঞ্চিত যাবতীয় তথ্যকে একসাথে জিনোম বলে। এই জিনোম কোষের ক্রোমোসোমের মধ্যে যে DNA থাকে সেইখানে এই তথ্য সঞ্চিত থাকে। ডিএনএ -র ছোট ছোট অংশগুলি যেখান থেকে আরএনএ -র কোড তথা জীবের প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির সঙ্কেত সঞ্চিত থাকে সেই অংশগুলিকে বলা হয় gene বা জিন। [3] এমন কোনো প্রমাণ নেই যে জিন আমাদের 'সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স' তৈরি করে। এজন্যই যখন 'গে জিন' নিয়ে আলোড়ন তৈরি হলো তখন হ্যামার নিজেই বলেছিলেন,
'' আমি কোনো গে জিন আবিষ্কার করিনি এবং আমরা ভাবিওনা যে এমন কোনো জিন এক্সিস্ট করে যা সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের জন্য নির্ধারিত'' [4] হ্যামারের গবেষণাকে বলা হয় 'জিন লিংকেজ স্টাডিজ' এক্ষেত্রে যেসব পরিবারে কোনো বিহেভিয়ার বেশি প্রকট সে পরিবারের মেম্বারদের থেকে টিস্যু সংগ্রহ করে dna বিশ্লেষণ করা হয়, এবং এক্সপ্রেশড হওয়া সেগমেন্ট গুলোকে মার্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এক্ষেত্রে বিষয়টি একটি সুইমিং পুলে লেন্স খোজার মতো, কারণ Gene Linkages studies গুলোতে কিছু জিন নিয়ে কাজ করা হয় সামগ্রিক জিন নিয়ে নয়। সামগ্রিক জিন নিয়ে গবেষণায় অবশ্য কন্ট্রাডিক্টরী ফলাফল পাওয়া যায় এবং কোনো সো কল্ড গে জিন আবিষ্কারও হয়নি। টুইন স্টাডির ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই।
এবার আসি, মস্তিকের আকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, মূলত দাবি করা হয় যেহেতু গে দের মস্তিষ্ক হেটেরোদের তুলনায় ভিন্ন, সেক্ষেত্রে 'গে মস্তিষ্ক' অর্থাৎ সমকামিতার মস্তিষ্ক ভিত্তিক কোনো ফাউন্ডেশন থাকবে যা ভুল। পূর্বে আলোচনা করেছিলাম যে আকার আকৃতির বিষয়টি মস্তিষ্কের ফাংশনেত সাথে যুক্ত নয়। এছাড়াও নিউরোপ্লাস্টিসিটি অনুযায়ী নিয়মিত কার্যকলাপের কারণেও মস্তিষ্কের কিছু অংশের আংশিক ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।
উল্লেখ্য যে সমকামিতার যে কেবল কোনো প্রমাণ নেই বিষয়টি তেমনই নয় বরং স্বভাবগতভাবেই মানুষ এর বিপরীত। কিভাবে? সাইকোলজিতে Disgust sensitivity বলে একটা কথা আছে। Ds অনুযায়ী মানুষের মধ্যে কিছু জিনিস সহজাত / স্বভাবগতভাবে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি করে এবং মানুষ সচেতনভাবে বিষয়টাকে মোরালি খারাপ হিসেবে দেখে। Emotion জার্নালে প্রকাশিত ২০০৭ সালের পল ব্লুমের গবেষণা অনুযায়ী, ডিসগাস্ট সেনসিটিভির জন্য মানুষের ইন্টুইটিভলি সমকামিতাকে অসমর্থন করে। [5] আবার ফ্রন্টিয়ার সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ সহজাতভাবেই সমকামিতাকে মোরাল ফাউন্ডেশনে 'ভুল' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। [6]
রেফারেন্স:
1.Watson, J. D., & Crick, F. H. (1953). Molecular structure of nucleic acids: a structure for deoxyribose nucleic acid. Nature, 171(4356), 737-738.
2.Bateson, W., & Mendel, G. (2013). Mendel's principles of heredity. Courier Corporation.
3. "What is a gene?: MedlinePlus Genetics". MedlinePlus. 17 September 2020. Retrieved 4 January 2021.
4. McKie R. 1993. The myth of the gay gene. The Press(30 July):9
5. Inbar, Y., Pizarro, D. A., Knobe, J., & Bloom, P. (2009). Disgust sensitivity predicts intuitive disapproval of gays. Emotion, 9(3), 435.
6.Wang, R., Yang, Q., Huang, P., Sai, L., & Gong, Y. (2019). The association between disgust sensitivity and negative attitudes toward homosexuality: the mediating role of moral foundations. Frontiers in psychology, 10, 1229.

Comments
Post a Comment