বিগব্যাং এবং মহাবিশ্ব
বিগব্যাং এবং মহাবিশ্ব
জর্জ লেমাইত্রে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এক পেপার লিখলেন। ‘উন উনিভার্স হোমোজিন দ্য মাস কনস্ট্যান্ট এত দ্য রেয় ক্রোয়সা, রেদাঁ কোম্প দ্য লা ভিতেস রাদিয়াল দেস নেবুলিয়াসেস এক্সট্রা-গালাকতিকেস’। ফরাসি ভাষায় লেখা পেপার। অর্থ ‘অপরিবর্তনীয় ভর এবং ক্রমবর্ধমান ব্যাসার্ধের সুষম ব্রহ্মাণ্ডের আলোকে গ্যালাক্সি-বহির্ভূত নক্ষত্রপুঞ্জদের দূরত্ববৃদ্ধির ব্যাখ্যা’। প্রবন্ধটি ছাপা হল ‘অ্যানাল্স দ্য লা সোসাইতে সায়েন্তিফিক দ্য ব্রাসেলস’ জার্নালে। পেপারটির প্রতিপাদ্য স্পষ্ট। এক-একটা গ্যালাক্সি কত স্পিডে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তা এখান থেকে তার দূরত্বের সমানুপাতিক। মানে, যে গ্যালাক্সি যত দূরে, সে সরে যাচ্ছে তত বেশি বেগে। দুটো গ্যালাক্সি। পৃথিবী থেকে দুটোর দূরত্ব যথাক্রমে ৩০ লক্ষ এবং ৬০ লক্ষ আলোকবর্ষ। প্রথমটা যদি পৃথিবী থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার দূরে চলে যায়, তবে দ্বিতীয়টা যাবে প্রতি সেকেন্ডে ১০০০ কিলোমিটার।
এই নিয়মটারই নাম ‘হাব্ল সূত্র’। কেন? বললেন লেমাইত্রে, তবু নামের মধ্যে হাব্ল এলেন কোথা থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের সমাজতত্ত্বে। লেমাইত্রে তাঁর পেপার ছাপলেন ব্রাসেলস-এর বিজ্ঞান সমিতির জার্নালে। এবং ফরাসি ভাষায়। ফলে তা সাড়া ফেলল না বিজ্ঞানের দুনিয়ায়। ও দিকে হাব্ল ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে এক পেপার ছাপলেন আমেরিকার ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে। শিরোনাম ‘আ রিলেশন বিটুইন ডিসটান্সেস অ্যান্ড রেডিয়াল ভেলোসিটি অ্যামং এক্সট্রা-গ্যালাকটিক নেবুলি’। সেই এক প্রতিপাদ্য। গ্যালাক্সিদের পৃথিবী থেকে দূরত্ব এবং তাদের সরে যাওয়ার বেগের সম্পর্ক। আমেরিকা থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পেপার বিশ্বের বিজ্ঞানীদের নজর কাড়ল। এবং ওই নিয়ম পরিচিত হল ‘হাব্ল সূত্র’ হিসেবে।
১৯৩১ সালে লিম্যাটার নতুন একটি হাইপোথিসিসের প্রস্তাবনা দেন। মহাবিশ্ব যদি ক্রমবর্ধমানই হয় তাহলে সুদূর অতীতে নিশ্চয়ই এটি ক্ষুদ্রতর ছিল এবং একেবারে শুরুতে মহাজগতের সকল বস্তু একটি প্রচন্ড ঘন আবদ্ধে একত্রিত ছিল। এর আগে আর্থার এডিংটন, উইলেম ডি সিটার ও আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীরা যে স্থির ও অবিকশিত মহাবিশ্বের মডেল নিয়ে কাজ করছিলেন তা অসন্তোষজনক হিসেবে পর্যবসিত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে লিম্যাটার প্রস্তাব করেন- সম্পূর্ণ মহাবিশ্বটি প্রাথমিকভাবে একটিমাত্র কণা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, তিনি যার নাম দেন ‘প্রিমিভাল এটম’ বা ‘আদি পরমাণু’। এই পরমাণুটি একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভেঙে যায় যার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় স্থান ও সময় এবং এই বিস্ফোরণের ফলে তৈরি হওয়া সম্প্রসারণ আজ পর্যন্ত চলমান রয়েছে। এই ধারণাটিই বিগ ব্যাং তত্ত্বের সূচনা করে। ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল জ্যোতির্বিদই একটি অনন্ত স্থিরাবস্থার মহাবিশ্বের মডেল চিন্তা করেছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই বিগ ব্যাংয়ের ‘সময়ের শুরু’ ব্যাপারটি ধর্মীয় ধারণা থেকে এসেছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। ধর্মের প্রতি লিম্যাটারের গভীর বিশ্বাসই হয়তো তাকে মহাজগতের শুরুর ব্যাপারে চিন্তা করতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল, যদিও তিনি বেশ পরিষ্কারভাবেই বলেছিলেন তার ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের চিন্তাভাবনার কোনো সংযোগ এবং কোনো সংঘর্ষ নেই। তিনি দুটোকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখেন যা মহাবিশ্বের রহস্যের সমান্তরাল দুটো ব্যাখ্যা হিসেবে বিশ্বাস করেন। পরবর্তীতে জর্জ গ্যামো বিগব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস" এর মাধ্যমে বিগব্যাং সংঘটিত হওয়ার পরের সময়ে মৌলের নিউক্লিয়াস সৃষ্টির বিষয় টি ব্যাখ্যা করেন। বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস (বা আদিম নিউক্লিওসিন্থেসিস) বলতে বিগ ব্যাং-এর কিছু পরেই মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে H-1, স্বাভাবিক, হালকা হাইড্রোজেন ছাড়া অন্য নিউক্লিয়াসের উৎপাদনকে বোঝায়। ১৯৬৫ সালে আমেরিকান জ্যোতিবিজ্ঞানি আর্নো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইনসন CMB/CMBR আবিষ্কার করেন। Cosmic microwave background হলো, এটি মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায় থেকে মহাবিশ্বের সমস্ত স্থান জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেহেতু মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায় থেকে আসা কোনো তরঙ্গকে বিজ্ঞানিরা সনাক্ত করতে পেরেছিলো, তার মাধ্যমে মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কে অবগত হতে পেরেছে। CMBR হলো, বিগ ব্যাং উৎপত্তির পক্ষে সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রমাণ। যা থেকে আমরা বুঝতে পারি মহাবিশ্ব বিগ ব্যাং থেকে উৎপত্তি হয়েছে। (১)
বিগব্যাং সিঙ্গুলারিটি:
বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটি বলতে কখনোই ফিজিক্যাল রিয়েলিটি কে বোঝাই না কেননা এটা ভ্যারিফায়েবল নয় এবং প্রেডিক্টেবল কোনো কিছুও না। মর্ডান ফিজিক্সে সিঙ্গুলারিটি কেবল মাত্র একটি গানিতিক দৃষ্টিভঙ্গি। সিঙ্গুলারিটি হলো একটা মেথমেটিক্যাল আইডিয়া। যদি আমাদের সম্প্রসারিত মহাবিশ্বকে একটি ফোলানো বেলুন হিসেবে কল্পনা করি এবং এর ক্রোনোলজি কে অতীতের দিকে ঘুরিয়ে দেই তাহলে দেখবো বেলুনের বাতাস ছেড়ে দিলে যেমন বেলুন ধীরে ধীরে চুপসে যেতে থাকে আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারিত রুপ তেমনই ভাবে সংকুচিত হতে থাকবে এবং এক পর্যায়ে সকল পদার্থ, স্থান-কাল একক অদ্বৈত বিন্দুতে উপস্থিত হবে এই থট কেই গানিতিক ভাবে এক্সপ্রেস করার সময় সিংগুলারিটি ( এককতা) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সিঙ্গুলারিটি মূলত কোনো ফিজিক্যাল স্টেট না, বরং প্ল্যাঙ্ক ইপোকের সময়কালে পদার্থবিজ্ঞানের সকল সূত্র ভেঙ্গে পরে একে সিঙ্গুলারিটি বলা হয় এবং টেকনিক্যালি যেহেতু সময়ের অস্তিত্বে আসার আগে ' before' বলে কিছু সম্ভব না তাই ফিজিক্সে বিগব্যাং এর প্রিমোর্ডিয়াল স্টেট কে সিঙ্গুলারিটি বলা হয়। মহাবিশ্বের শুরু আছে এ বিষয়টি কোনো ফিজিসিস্ট ই এড়াতে পারেন না। (২)
সূত্র: এস্ট্রোনমি ম্যাগাজিন
রেফারেন্স:
১. https://doi.org/10.1103/PhysRev.74.505.2
*https://iopscience.iop.org/article/10.1086/310075
২. Lisa Grossman (2012), Why physicists can't avoid a creation event. NewScientist.

Comments
Post a Comment