বিজ্ঞানী এডুইন হাবল বনাম হার্লি শ্যাপলি এবং দ্য গ্রেট ডিবেট
বিংশ শতকের শুরুতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথের আকার সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিলেন। সাধারণত, তারা বিশ্বাস করত যে এটি কয়েক হাজার আলোকবর্ষের চেয়ে বেশি নয়, এবং সম্ভবত এর থেকেও যথেষ্ট কম। ১ আলোকবর্ষ, প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন মাইল) এছাড়াও, বিংশ শতকের প্রথম দিকে পর্যবেক্ষণগুলি দেখে মনে করা হতো যে আমাদের সৌরজগৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি ছিল।
১৯০৮ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিয়েটা লিভিট একটি উল্লেখযোগ্য নিয়মের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যা সেফিডস ( সেফিডস এক ধরনের নক্ষত্র) মেনে চলে । ফটোগ্রাফের রুটিন তুলনা করার সময় তিনি পরিবর্তনশীল তারা আবিষ্কার করেছিলেন, তারাগুলো কিছু ফটোগ্রাফে উজ্জ্বল এবং বিভিন্ন সময়ে তোলা অন্যান্য ফটোগ্রাফে ম্লান। লেভিট লক্ষ্য করেছেন যে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র যত উজ্জ্বল, তার সময়কাল তত বেশি।
লেভিট যে ১৬ টি পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের পরিমাপ করেছেন তারা সবাই একই নক্ষত্রের একটি গ্রুপ, ছোট ম্যাগেলানিক ক্লাউড। সকলতারা পৃথিবী থেকে প্রায় একই দূরত্বে ছিল। তাই তাদের আপাত মাত্রা (পর্যবেক্ষিত উজ্জ্বলতা) সরাসরি তাদের পরম মাত্রার সাথে সম্পর্কিত ছিল (অভ্যন্তরীণ উজ্জ্বলতা। লিভিট এএ গবেষণার উপসংহারটি ছিল এমন - সেফিডের সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা থেকে ন্যূনতম উজ্জ্বলতার সময়কাল বা সময় যত বেশি হবে, নক্ষত্রের অন্তর্নিহিত উজ্জ্বলতা তত বেশি হবে।
সেফিড-টাইপ পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের সময়কাল-উজ্জ্বলতার সম্পর্ক- সময়ের সাথে তাদের উজ্জ্বলতা কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা দেখান ১৯১৮ সালে হার্লো শ্যাপলি নামে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। হার্লো শ্যাপলি যুক্তিসঙ্গত অনুমান করেছিলেন যে দূরবর্তী গ্লোবুলার ক্লাস্টারের সেফিডগুলি কাছাকাছি সেফিডসের মতো একই পদার্থবিদ্যাকে মেনে চলে। তিনি দূরবর্তী সেফিডের সময়কাল পর্যবেক্ষণ করেছেন, তার পরম মাত্রা, আলোকসজ্জার গ্রাফ থেকে তাদের অনুমিত পরম মাত্রা এসব নিয়ে গবেষণা করলেন এবং সেই পরম মাত্রাকে পর্যবেক্ষণ করা আপেক্ষিক মাত্রার সাথে তুলনা করলেন। এতে করে অনেক দূর-দূরান্তের সেফিডের দূরত্ব জানা গিয়েছিল। —এবং তারা যে গ্লোবুলার ক্লাস্টারে বাস
করত সেটারও আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ( তিনি তাদের দূরত্ব অনুমান করার জন্য অন্যান্য, ক্রুডার পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন।
শ্যাপলির পর্যবেক্ষণঃ সূত্র Goggle Photo
মানুষ এবং তাদের নির্দিষ্ট গ্রহের তাৎপর্য হ্রাসের সাথে সাথে আরও হ্রাস পেয়েছে। শ্যাপলি একটি ছোট মহাবিশ্বের বিশ্বাসের ঐতিহাসিক অগ্রগতি ঘটিয়েছেন , এমন একটি মহাবিশ্ব যার কেন্দ্রে মানবজাতি রয়েছে, পৃথিবী এবং অন্যান্য বস্তুগুলোরয়েছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে দূরে। মহাবিশ্বের জ্যামিতিক আকৃতি ভূমিকেন্দ্রিক থেকে সূর্যকেন্দ্রিক এবং সেখান থেকে সৌরজগতের বাইরের ধারণা এসেছিল।। মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনও কম ছিল না এক্ষেত্রে। কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করেছিলেন এ নিয়ে যে সৌরজগৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি ছিল এবং মানুষ মহাবিশ্বে একটি বিশেষ অংশে বাস করে। যদিও শ্যাপলির মতবাদ অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো দর্শন থেকে নেয়া হয়েছিলো।
The Great Debate:
শ্যাপলির গ্যালাক্সি তার পূর্ববর্তী অনুমানের চেয়ে অনেক বড় ছিল তার মতে এটা সত্যিই সমগ্র মহাবিশ্ব হতে পারে। কারণ শ্যাপলি দেখিয়েছিলেন যে গ্লোবুলার ক্লাস্টারগুলি স্পষ্টভাবে গ্যালাক্সির অংশ, স্বাধীন দ্বীপাকৃতির মহাবিশ্ব নয়। শ্যাপলির মতে সর্পিলাকার নেবুলা গুলো আমাদের ছায়াপথেরই অংশ এবং আমাদের ছায়াপথ পুরোটাই মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের আকার নিয়ে তিনি এ ধারনাই রাখতেন। তিনি বলেন,
নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্যালাকটিক মহাবিশ্ব একটি একক, বিশাল, সর্ব-বোধগম্য একক... এই ধরনের বিন্যাস গ্রহণের ফলে আমাদের নাক্ষত্রিক 'মহাবিশ্বের' বহুত্বের কোনো প্রমাণ নেই। - শ্যাপলি
শ্যাপলি তার গবেষণার উপসংহার রক্ষা করেছেন ২৬ শে এপ্রিল ১৯২০ -এ ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সে উত্থাপিত "Great Debate "এ। সেখানেও তার প্রধান উদ্বেগ ছিল ছায়াপথের আকার। তার প্রস্তাবিত মডেলটি অনেকাংশে সঠিক ছিল অনেক ব্যাখ্যাও প্রদান করতে পারতো। কিন্তু তথাপি তার অবস্থান দুর্বল ছিল যখন তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সর্পিল নীহারিকা, যা অনেক ছোট বলে মনে হয়েছিল তা আমাদের ছায়াপথেরই অংশ। তার প্রতিপক্ষ, হেবার কার্টিস, যুক্তি দিয়েছিলেন যে আমাদের গ্যালাক্সিটি শ্যাপলির মতে অনেক বড় হতেই পারে, তবুও সেটা অনেক দ্বীপআকৃতির মহাবিশ্বের মধ্যে একটি মাত্র, কিন্তু 1920 সাল পর্যন্ত শ্যাপলির অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।
হাবলের বিপ্লবী উত্থানঃ
1917 সালে এডুইন হাবল তার ডক্টরাল থিসিসে উল্লেখ করেছেন যে ক্যাটালগগুলিতে ইতিমধ্যেই প্রায় ১৭,০০০টি ছোট, অস্পষ্ট নেবুলাস বস্তু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যার সাহায্যেশেষ পর্যন্ত তারার গ্রুপিংয়ে থাকা সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। যদিও তখনও সম্ভবত ১৫০,০০০টি নেবুলা টেলিস্কোপের নাগালের মধ্যে ছিল। তিনি লিখেছেন, "নীহারিকাগুলির প্রকৃতি সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, এবং এখনও এগুলোর কোন উল্লেখযোগ্য শ্রেণীবিভাগের পরামর্শ দেওয়া হয়নি; এমনকি একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও প্রণয়ন করা হয়নি। ❞ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কাজ করার পর, হাবল মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরির কর্মীদের সাথে যোগ দেন। সেখানে তিনি নতুন 100 ইঞ্চি রিক্লেক্টর সমৃদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে নীহারিকাগুলির ছবি তোলেন। হাবল একটি অনিয়মিত নীহারিকাতে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র আবিষ্কার করেছিলেন ততদিনে শ্যাপলি হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরির জন্য মাউন্ট উইলসন ছেড়ে চলে গেছে। হাবল ১৯২৩ সালে শ্যাপলিকে তার আবিষ্কারের কথা জানিয়েছিলেন। হাবল আরও বলেছিলেন যে তিনি আরও পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের অনুসন্ধান করতে যাচ্ছেন। হাবল বলেন
দুর্দান্ত সর্পিলগুলি ( নেবুলা) ... দৃশ্যত আমাদের তারার সিস্টেমের বাইরে রয়েছে। —এডউইন হাবল, ১৯১৭
১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপ এর সাথে হাবল সূত্রঃ BBC sky
১৯২৪ সালে হাবল শ্যাপলিকে চিঠি লিখেছিলেন। হাবল চিঠিতে শ্যাপলি কে বলেন, ❝আপনি শুনতে আগ্রহী হবেন যে আমি অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা [M31]-এ একটি পরিবর্তনশীল সেফিড [তারকা] খুঁজে পেয়েছি। ❞
হাবল আরও যেটা খুঁজে পেয়েছেন সেটা হচ্ছে আমাদের থেকে সেফিডের [M31] দূরত্ব ৩০০,০০০ পার্সেক এর কিছু বেশি।" এটি ছিল মোটামুটি এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ, এবং আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের বাইরের সীমানা সম্পর্কে শ্যাপলির অনুমানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দূরত্ব। হাবলের চিঠি পড়ার সময়, শ্যাপলি তার অফিসে থাকা একজন সহকর্মীকে মন্তব্য করে বলেছিলেন,
এই যে চিঠিটি আমার ধারণাকৃত মহাবিশ্বকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ( শ্যাপলি-১৯২৪)
শ্যাপলি স্বীকার করেছেন যে হাবল যে বিপুল সংখ্যক ফটোগ্রাফিক প্লেট পেয়েছিল তা এটা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে তারাগুলি প্রকৃত পরিবর্তনশীল। শ্যাপলি নীহারিকা সমস্যার এই সুনির্দিষ্ট সমাধান দেখে খুশিও হয়েছিলেন, যদিও তা শ্যাপলির মতবাদ কে বাতিল করে দিয়েছিল।
সর্পিল নীহারিকাতে পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের আবিষ্কার, এবং দূরত্ব নির্ণয় করে নিশ্চিত করার পর, ১৯২৫ সালের নববর্ষের দিনে তার এই কাজ আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির একটি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। তিনি তার প্রাথমিক কাগজটি নিয়ে পরবর্তী চার বছরে আরও কাজ করেন এবং আরও বিশদভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। ১৯৩০ এর দশক শেষ হওয়ার আগে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সর্পিল নীহারিকা আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের বাইরে রয়েছে। আগের দশকে শ্যাপলি মহাবিশ্বের আয়তনকে প্রায় দশ গুণ করে বাড়িয়েছিলেন। হাবল এটিকে আরও দশ গুণ বড় প্রমাণ করেছেন, যদিও মহাবিশ্ব বিশাল । হাবলের মহাবিশ্ব আর শ্যাপলি দ্বারা কল্পনা করা মহাবিশ্ব দুটো সর্বত্র বোধগম্য ছিল না। তবে হাবলের কাজের পর থেকে বোঝা যায় যে মহাবিশ্ব মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত। যা সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ থেকে দেখা যায়। হাবল পরবর্তী
দেখিয়েছে যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, যদিও প্রায় সবাই তখন বিশ্বাস করত মহাবিশ্ব স্থির এবং অসীম , কিন্তু না মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে এবং সময়ই ঠিক করে দেয় যে মহাবিশ্ব অসীম নয় বরং সসীম।
সেফিড নেবুলা ( Messier 31) সূত্রঃ AIP
রেফারেন্সঃ
1. Title: The 1920 Shapley-Curtis Discussion: Background, Issues, and Aftermath
Authors: Trimble, V. Journal: Publications of the Astronomical Society of the Pacific, v.107, p.1133
2. Hoskin, M. 1976, The 'Great Debate': What Really Happened?, J. Hist. Astron., 7, 169
3. Smith, R. W., 1982, The Expanding Universe, Astronomy's 'Great Debate' 1900-1931, (Cambridge University Press, Cambridge)
4. Struve, O. and Zebergs, V. 1962, Astronomy of the 20th Century, (McMillan, New York
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
Comments
Post a Comment