এপেন্ডিক্স কি বিবর্তনীয় আবর্জনা?
গত পর্বে আমরা নিস্ক্রিয় অঙ্গ evolutionary baggage
নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ জানবো এপেন্ডিক্স নিয়ে।
এপেন্ডিক্স
ভেস্টেজিয়ালিটি বলতে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে বোঝায় প্রাণীর বিদ্যমান অকার্যকর অঙ্গ যা তার পূর্বপুরুষের মধ্যে কার্যকরী ছিলো এবং পরবর্তীতে বিবর্তনের মাধ্যমে আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়েছে। (১)
অর্থাৎ অকার্যকর অঙ্গ একেবারে অকার্যকর নয় এর সামান্য কিছু কাজ এখনো থাকতে পারে যদিও এই সংজ্ঞাটি ৯০ এর দশকের পর প্রস্তাবিত করা হয় যখন দেখা যায় মানুষের নিস্ক্রিয় দাবিকৃত অঙ্গাদি আসলে একেবারে নিস্ক্রিয় নয়। যাইহোক সাধারণ পূর্বপুরুষের প্রমাণে এই ভেস্টিজিয়াল অর্গান হোমোগলাস বৈশিষ্ট্য এর মতোই ব্যবহার করা হয় যেহেতু পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষ এসেছে সেক্ষেত্রে তার মধ্যে নিস্ক্রিয় অঙ্গ রয়েছে আবার নিস্ক্রিয় অঙ্গ থাকার কারণ হলো সাধারণ পূর্বপুরুষ। হমোলজির চিরাচরিত সার্কুলার রিজনিং ফ্যালাসিতে এই যুক্তিটিও দুষ্ট।
এপেন্ডিক্সঃ সূত্রঃ ব্রিটানিকা
মানুষের নিস্ক্রিয় অঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটাকে ব্যবহার করা হয় তা হলো এপেন্ডিক্স। আমাদের পাকস্থলীর একেবারে নিচ থেকে শুরু হওয়া প্যাচনো নালীর মতো অংশের নাম ক্ষুদ্রান্ত্র (small intestine), এর পরেই নালীটি একটু মোটা হয়ে বৃহদান্ত্র (large intestine) নাম ধারন করেছে। এই ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলের কাছাকাছি বৃহদান্ত্রের কাছ থেকে রয়েছে ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা বেশ চিকনা করে প্রবর্ধিত অংশ, যার নাম এপেন্ডিক্স।
কিন্তু বিগত কয়েক দশকে প্রমাণ হয়েছে যে এপেন্ডিক্স নিস্ক্রিয় অঙ্গ নয়।(২) ২০১৪ সালে একটি তুর্কি গবেষণাপত্রে দেখা যায় যাদের অনেক ক্ষুদ্র এপেন্ডিক্স রয়েছে তাদের কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। (৩) এখান থেকে ধারনা করা হচ্ছে কোলন ক্যান্সার মোকাবেলাতে এপেন্ডিক্সের ভূমিকা রয়েছে। পরিপাক নালীর প্রদাহজনিত একটা রোগ বিদ্যমান যার নাম ক্রন'স ডিজিজ। ২০০৩ সালের দিকের একটা গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী এপেন্ডিক্স না থাকা ব্যক্তিদের রোগটিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। (৩) আর এখন পর্যন্ত বেশ নিশ্চিত হওয়া তথ্যটি হলো এপেন্ডিক্স নম্র, ভদ্র, উপকারি ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল।(৪)এসব ব্যাকটেরিয়া আমাদের বৃহদান্ত্রকে অনেক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে থাকে। (৫)
এপেন্ডিক্সে লিম্ফোয়েড কোষের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখান থেকে কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে। অ্যাপেন্ডিক্স এ লিম্ফোয়েড টিস্যু এক্যুমুলেটেড হতে থাকে। বি লিম্ফোসাইট ম্যাচ্যুরেশন আর Ig A হয় , যা বডির ইম্যুউন রেসপন্সে রোল প্লে করে। আর এগুলো রোগপ্রতিরোধ সিস্টেমের হয়ে কাজ করে আমাদের পরিপাকনালীকে সুস্থ রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। লিম্ফ টিস্যু হচ্ছে শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশকে বহিঃশ্ত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য যেমন আর্মি, নৌ এবং বিমান বাহিনী অর্থাৎ প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকে, মানবদেহ নামক রাজ্যের সার্বিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে এই লিম্ফ টিস্যুগুলোর উপর। আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে রয়েছে এই লিম্ফ টিস্যুর প্রতিরক্ষাব্যূহ। এদের ফাঁকি দিয়ে দেহের ভেতরে কোনো ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি জীবাণু প্রবেশ করবে তার জো নেই। লিম্ফ টিস্যুগুলো শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (যেখান দিয়ে জীবাণুদের প্রবেশের সম্ভাবনা বেশি)নোড এর আকারে জমা হয়ে থাকে- অনেকটা সেনানিবাসের মতো। এসব কোষীয় সেনানিবাসে থাকে টি(T) লিম্ফোসাইট এবং বি(B) লিম্ফোসাইট কোষ সৈনিকেরা।
এদের মধ্যে টি লিম্ফোসাইটগুলোর কাজ অনেকটা ক্যাপ্টেনের মতো- তারা দেহের প্রতিরক্ষা আক্রমণ কী রকম হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিশেষ ধরণের রাসায়নিক পদার্থ (Lymphokines) নিঃসরণ করে অন্যান্য সৈনিক কোষ যেমন, নিউট্রোফিল (Neutrophil) কোষ, ম্যাক্রোফেজ কোষ (Macrophage), প্রাকৃতিক ঘাতক কোষ (Natural Killer cell)-দের আক্রমণের স্থানে সন্নিবেশিত করে। এ ছাড়া তারা নিজেরা ভাইরাস এবং টিউমার কোষকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়।
টি কোষগুলোর আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে লিম্ফ টিস্যুকে বি লিম্ফোসাইট তৈরিতে প্রেরণা দেয়া।
অন্যদিকে বি লিম্ফোসাইটগুলোর কাজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা তৈরি করে দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম অস্ত্র এন্টিবডি। এই এন্টিবডি অণুগুলো ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস-এর গায়ের সাথে লেপ্টে গিয়ে তাদের ধ্বংস করে দেয়। (৬)
T-lymphocyte & B-lymphocyte Source: Byju's
কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, এপেন্ডিক্স কেটে ফেলার পর অন্ত্রে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। (৭) এক গবেষণায় দেখা গেছে যাদের এপেন্ডিক্স কেটে ফেলা হয় তাদের সিউডোমেমব্রেনাস কোলাইটিস-নামক মারাত্মক রোগের ঝুঁকি প্রায় চারগুণ বাড়ে। (৮)
সুতরাং এপেন্ডিক্স কে নিস্ক্রিয় অঙ্গ হিসেবে দেখানো যাচ্ছেনা মোটেও তাছাড়াও বিবর্তনীয় পরিক্রমায় কিছু ফাংশন রয়ে গেছে বলাটাও অনুচিত কেননা ফিলোসোফি অফ বায়োলজির "ফাংশন" এর সংজ্ঞানুসারে এপেন্ডিক্স এর বায়োলজিক্যাল ফাংশন রয়েছে কেবল বায়োকেমিক্যাল এক্টিভিটি কিংবা কার্যকারণের প্রভাব নয়। দ্বিতীয়ত ভেস্টেজিয়াল অর্গানের নতুন সংজ্ঞার পরিবর্তে পুরনো সংজ্ঞা আমলে নিলে সার্কুলার রিজনিং এর জন্য একে আর সাধারণ পূর্বপুরুষের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার ই করা যায় না অনেকটা হমোলজির মতো। একে বলা যায় সাধারণ পূর্বপুরুষের প্রমাণের শাখের করাত বা উভয় সঙ্কট।
সাধারণ পূর্বপুরুষের জন্য অনুমিত সাদৃশ্য যা একাধিক প্রজাতির প্রাণী, একাধিক গোত্রের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে তা আদোতে সাধারণ পূর্বপুরুষের ধারণা প্রমাণ করেনা। বরং অধিকাংশ প্রমাণ সাধারণ নকশার দিকে ইঙ্গিত করে। অঙ্গসাংস্থানিক সাদৃশ্য, ভ্রুণতাত্ত্বিক সাদৃশ্য, জিন-তাত্ত্বিক সাদৃশ্য, নন-কোডিং ডিএনএ এবং নিস্ক্রিয় অঙ্গের মতো বিষয়াদি বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুমিত সাধারণ পূর্বপুরুষের ধারণাকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ। সুতরাং কোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন কোনো মানুষ বিজ্ঞানের এই ওয়ার্কিং মডেল বা ফ্রেমওয়ার্ককে ফ্যাক্ট বা প্রমাণিত সত্য বলে দাবি করবেনা বলে আশা করা যায়, এর দ্বারা ধর্ম কিংবা স্রষ্টার অস্তিত্বের মতো বিষয়াদিকে চ্যালেঞ্জ কিংবা বাতিল করার চিন্তা তো বহু দূরের কথা।
[2]. https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/24497155/
[3]https://badgut.org/information-centre/a-z-digestive-topics/appendectomy/
[4].https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S002251930
[5].https://www.cghjournal.org/article/S1542-3565(11)00580-5/fulltext
[6].https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1542337
[7]Amanda Macmillan (2017), Your Appendix May Not Be Useless After All. TIME Magazine
[8] Rob Dunn (2012), Your Appendix Could Save Your Life: The humble organ may help us recover from serious infections. Scientific American; Gene Y. Im et.al. (2011), The appendix may protect against Clostridium difficile recurrence. Clinical Gastroenterology and Hepatology 9: 1072–1077
.jpeg)
.png)
Comments
Post a Comment