বিবর্তন, বিশ্বাস এবং সেভান্তে পাবোর নোবেল জয়।


১. প্রজাতি কাকে বলে? 

যদি দুই জীবের অন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে বংশধরের জন্ম হয় এবং সেই বংশধরের মাঝেও প্রজননের ক্ষমতা থাকে, তা হলে জীব দুটি একই প্রজাতির্ভুক্ত এবং তারা অন্যান্য গোষ্ঠীর থেকে প্রজনন বিচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। এটি হলো বায়োলজিক্যাল প্রজাতি ধারণা। (১) অবশ্য এটিই কেবল একমাত্র প্রজাতির সংজ্ঞা নয় প্রজাতির প্রায় ২৪-৩৬ টি সংজ্ঞা রয়েছে। তবে এই সংজ্ঞা টি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বায়োলজিক্যাল স্পিসিস এর সংজ্ঞা অনুযায়ী একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রাণীরা অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে আইসোলেটেড ( প্রজনন বিচ্ছিন্ন) অবস্থায় থাকে। তবে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রজাতির বেবুন, ভালুক, চিতা, নেকড়ে-বুনো কুকুর এরা নিজেদের মাঝে আন্তঃপ্রজনন করতে পারে। পাখিদের প্রায় ১৬% প্রজাতি বন্য পরিবেশে আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে উর্বর বংশধর তৈরি করে। (২) 

Google photo


*প্রজাতি বিভক্তিকরণের বিভিন্ন রুপ-

বায়োলজিক্যালি কোনো জীব অন্য গোষ্ঠীর থেকে আইসোলেটেড ( প্রজনন বিচ্ছিন্ন) অবস্থায় থাকলে তা ভিন্ন প্রজাতি বলে গন্য হবে তবে প্রজাতির বিভক্তিকরণে কেবল বায়োলজিকাল পার্স্পেক্টিভ ই নেয়া হয়না এসব ক্ষেত্রে মরফোলজিক্যাল, ফাইলোজেনেটিক এবং শারীরবৃত্তীয় ( ফেনোটাইপ) দিকগুলোও বিবেচনা করা হয়। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে ক্লাসিফিকেশন করলেও তা বায়োলজিক্যাল স্পিসিস এর সংজ্ঞা অনুযায়ী আলাদা প্রজাতি হিসেবে গন্য হবে না আবার ইকোলজিকাল দিক থেকে কোনো প্রানীকে ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে ক্লাসিফিকেশন করলে তা আবার মরফোলজিক্যাল পার্স্পেক্টিভ থেকে এক হবে না। বর্তমানে প্রজাতির সংজ্ঞা নিয়েই রয়েছে তুমুল বিতর্ক, এর জন্য আমাদের আরো বিস্তারিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রজাতি এবং প্রজাতিকরণ নামে পিয়ার রিভিউ গবেষণাপত্রটি পড়তে পারেন (৩) 


২/নিয়ান্ডারথাল এবং ডেনিসোভান কে কেন ভিন্ন প্রজাতি বলা হয়? 

একচুয়ালি সবাই ভিন্ন প্রজাতি বলেন এমন নয়। বিজ্ঞানীদের এক গ্রুপ বলেন এরা আসলে হোমো সেপিয়েন্সের ই দূরবর্তী কোনো প্রজাতি বা উপপ্রজাতি তারা এটাকে দেখেন বায়োলজিকাল স্পেসিসের সংজ্ঞা অনুযায়ী। তবে কিসের ভিত্তিকে বিজ্ঞানীরা নিয়ান্ডারথাল এবং ডেনিসোভানদের ভিন্ন প্রজাতি বলেন? নিয়ান্ডারথালদের সাথে আধুনিক মানুষ গঠনগত এবং আচরণগত পার্থক্য বিদ্যমান এসবের ভিত্তিতে প্রজাতি বিভক্তিকরণের মূল ভিত্তি হচ্ছে মরফোলজিক্যাল প্রজাতির ধারণা। (৪) এছাড়াও নিয়ান্ডারথাল এবং ডেনিসোভান রা হোমোসেপিয়েন্স এর সাথে ইন্টারব্রিডিং করেছিল তবে সময়ের আবর্তনে আলাদা হয়ে যাওয়ায় এদের সাথে হোমো সেপিয়েন্স এর ইন্টারব্রিডিং এর ফলে ফার্টাইল বাচ্চা দেয়া কমতে থাকে এবং এক পর্যায়ে এরা আলাদা হয়ে যায়। মরফোলজিক্যাল প্রজাতির ধারণা থেকে নিয়ান্ডারথাল দের ভিন্ন প্রজাতি বলা এবং বায়োলজিক্যাল প্রজাতির ধারণা থেকে না বলা নিয়ে শ্রেনীবিন্যাসে ওক প্রকার যুদ্ধ বিদ্যমান। পাবো তার বই " Neanderthal man: In search of lost genomes " বইতে এই ধরনের " শ্রেণীবিন্যাস যুদ্ধ"কে অমীমাংসিত হিসাবে বর্ণনা করে বলেছেন ❝এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রজাতির কোনো সঠিক সংজ্ঞা নেই ❞ যদি বায়োলজিকালি নিয়ান্ডারথাল কে আলাদা প্রজাতি ধরেই নেই তথাপি হিউম্যান ইভোলিউশন বা ম্যাক্রো ইভোলিউশন প্রমাণিত হয়না। কারণ এরা একই জেনাসের অন্তর্গত। অন্যদিকে শিম্পাঞ্জি অন্য জেনাসের অন্তর্গত। এক্ষেত্রে মানুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ শিম্পাঞ্জি ছিলো এটা প্রমাণ হয়না বা ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে শিম্পাঞ্জি বা এজাতীয় কোনো প্রানী থেকে মানুষের আগমন এই বিষয়টাও প্রমাণ হয়না। ( বিবর্তন বলতে বানর থেকে মানুষ এমন টা বোঝায় না বলা পাবলিক দের এনথ্রোপলজিস্ট বার্নাড উডের Human evolution: A very short introduction বইটা পড়ার সাজেশন রইলো) 

৩/স্যাভান্তো পাবো কি হিউম্যান ইভোলিউশন প্রমাণ করেছেন? 

না তিনি প্রমাণ করেননি। ইভোলিউশন একটা ম্যাটেরিয়ালিস্টিক প্রজেক্ট। জীবজগতের প্রাণী বৈচিত্র্য কে ব্যাখ্যা করার একটি জাগতিক উপায়। এক্ষেত্রে সকল গবেষক হিউম্যান ইভোলিউশন ঘটেছে এই বিষয় টা ধরে নিয়েই গবেষণা করেন। ''জিন সিকুয়েন্সিং করে প্যাবো ডেনিসোভা নামের নতুন প্রজাতির অস্তিত্ব ঘোষণা করতে কিভাবে সমর্থ হলো''? - সেক্ষেত্রে আমাদের জানা প্রয়োজন শুধুমাত্র সিকোয়েন্স ডাটা দিয়ে নতুন প্রজাতি ডিফাইন করা টাফ। ফিজিওলজিক্যাল, এনাটমিক্যাল, ফাঙ্কশনাল, বেহ্যাভিওরাল ইত্যাদি ইম্পরট্যান্ট ডাটা মিসিং। আর বায়োলজিকালি প্রজাতি ডিফাইন করলেও হিউম্যান ইভোলিউশন প্রমাণ হয়না উপরের পয়েন্ট এ ব্যাখ্যা করেছি। ''নোবেল কমিটি মানতে বাধ্য হলো কেন?''

- সাইন্টিফিক কমিউনিটি অলওয়েজ এক্সিস্টিং সেটিং এ পসিবল এমন এক্সপেরিমেন্টাল ডাটার ভিত্তিতে ডিসিশন দেয়। যেমন ধরুন, সিকোএন্সিং একটা প্যারামিটার। এর বেসিসে তারা বললো নতুন স্পেসিস আবিষ্কৃত হয়েছে, তারা কখনো বেহেভিওরাল বা ফাঙ্কশনাল ডাটা চাইবে না কারণ তারা জানে এটা জেনারেট করা পসিবল না। এই প্রিন্সিপল অন্য গবেষণার ক্ষেত্রেও প্ৰযোজ্য।


৪/ম্যাক্রো ইভোলিউশন কি আগে থেকেই প্রমাণিত? 

মোটেও না। বিবর্তনীয় যত মেকানিজম নিয়ে আলোচনা করা হয় সবকিছুই মাইক্রো ইভোলিউশন এর মেকানিজম। যেহেতু ম্যাক্রো ইভোলিউশন এর জন্য লক্ষ বছর সময় প্রয়োজন সেক্ষেত্রে এটাকে এক্সপেরিমেন্টালি প্রুফ করা প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে মাইক্রো ইভোলিউশন এর মেকানিজম সমুহ কে বিজ্ঞানীরা ম্যাক্রো ইভোলিউশন এর ব্যাখ্যা হিসেবে যথেষ্ট ধরে নিয়ে গবেষণা চালান। ম্যাক্রো ইভোলিউশন কেবলমাত্র একটা ইনফারেন্স। এজন্যই ১৯৮০ সালে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইভোলিউশনারি বায়োলজিস্টদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন বায়োলজিস্ট শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের " ম্যাক্রো ইভোলিউশন" শীর্ষক সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের কাজ ছিলো "প্রজাতির উৎপত্তির অন্তর্নিহিত মেকানিজমগুলো বিবেচনা করা " তাদের সম্মিলিত কাজের ফলাফল ;

The central question of the Chicago conference was whether the mechanisms underlying microevolution can be extrapolated to explain the phenomena of macroevolution. …The answer can be given as a clear, No." 


  1. অর্থাৎ শিকাগো কনফারেন্সের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিলো ম্যাক্রো ইভোলিউশন এর ঘটনা কে ব্যাখ্যা করার জন্য মাইক্রো ইভোলিউশন এর অন্তর্নিহিত মেকানিজমগুলো কে পূর্বানুমান করে নেয়া যেতে পারে কিনা, এর পরিষ্কার উত্তর ছিলো, না! (৫) 


হিউম্যান ইভোলিউশন এর বেসিক এজাম্পশন দাঁড়িয়ে আছে হমোলজির উপর, একাডেমিয়া তে এ নিয়েও বেশ ভালো সমস্যা বিদ্যমান। পরবর্তীতে কখনো ইভোলিউশন নিয়ে সিরিজ করলে এসব বিষয় এ আলোচনা করা যাবে।


রেফারেন্সঃ 

 ১.Mayr, Ernst (1942). Systematics and the Origin of Species. New York: Columbia University Press.

২. Ottenburghs, J., Ydenberg, R. C., van Hooft, W. F., Van Wieren, S. E., & Prins, H. H. (2015). The Avian Hybrids Project: gathering the scientific literature on avian hybridization. Ibis, 157(4), 892-894.

৩.Aldhebiani, A. Y. (2018). Species concept and speciation. Saudi journal of biological sciences, 25(3), 437-440.

৪. Harvati, K., Frost, S. R., & McNulty, K. P. (2004). Neanderthal taxonomy reconsidered: implications of 3D primate models of intra-and interspecific differences. Proceedings of the National Academy of Sciences, 101(5), 1147-1152.

৫.Lewin, R. (1980). Evolutionary theory under fire: An historic conference in Chicago challenges the four-decade long dominance of the Modern Synthesis. Science, 210(4472), 883-887.

Comments

Popular

ইনফিনিট রিগ্রেস - অসীমের দিকে প্রত্যাবর্তন