মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়-৪

 মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়:৪ 

গত পর্বে আমরা মিউটেশন এবং জিন ফ্লো নিয়ে জেনেছি।

আজ আমরা আরেকটি মেকানিজম জেনেটিক ড্রিফট সম্পর্কে জানবো। 



১.জেনেটিক ড্রিফট

কোনো পপুলেশনে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই একেবারে র‍্যান্ডমলি হঠাৎ করে পপুলেশনের মধ্যে এলিল ফ্রিকোয়েন্সির কমে যাওয়া বা নিঃশেষ হয়ে যাওয়াকে জেনেটিক ড্রিফট বলা হয়। জেনেটিক ড্রিফ্টের কারণে জিনের ভিন্নতা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে এবং এর ফলে জেনেটিক বৈচিত্র্য হ্রাস পেতে পারে । (১৫)

স্যাম্পল এরর এবং বিবর্তনঃ

ধরুন কোনো জারে ২০ টি লাল এবং ২০ টি সবুজ মার্বেল আছে। মার্বেল গুলোকে একটি পপুলেশন হিসেবে বিবেচনা করুন। এবার র‍্যান্ডমলি না দেখে জার থেকে ৫ টি মার্বেল তুলে নিন। এভাবে পরপর ৪ বার ৫ টি করে মোট ২০ টি মার্বেল র‍্যান্ডমলি তুলে নিন। পরবর্তীতে মার্বেল ভর্তি জারে যে পরিবর্তন আসবে তাই জেনেটিক ড্রিফট।

 From: Google photo


বাস্তবসম্মত উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যাক। ধরুন সাদা রঙের ৫ টি বিটল আছে (RR) ধূসর রঙের বিটল আছে (Rr) ১০ টি এবং কালো রঙের বিটল আছে (rr) ৫ টি। বিটলের পপুলেশন এ মোট বিটল আছে ২০ টি। রঙের ক্ষেত্রে সাদা রঙের ডমিনেন্ট ধরলাম R কে এবং রিসেসিভ ধরলাম r কে। যাইহোক, একদিন কি হলো, কোনো এক লোক বিটলের ওই পপুলেশনের উপর পা মাড়িয়ে চলে গেল ফলে র‍্যান্ডমলি ৫ টা সাদা রঙের বিটল মারা পড়ল। ফলাফল RR ছিলো যে ৫ টা সেই ৫ টা সাদা বিটল ই মারা পড়লো। অর্থাৎ পরবর্তীতে প্রজন্মে RR এলিল সমৃদ্ধ বিটল আসার সম্ভাবনা একেবারেই কমে গেল। সুতরাং হতেই পারে যে কয়েক প্রজন্ম পরে আর RR জিনোটাইপ এর বিটল পাওয়া যাবে না। ন্যাচারাল সিলেকশনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সিলেকশন হয় অনূকূল পরিবেশের জন্য। কিন্তু জেনেটিক ড্রিফট এর ক্ষেত্রে এমন কিছু নেই। র‍্যান্ডমলি ড্রিফট হওয়ায় এর অনূকূল প্রতিকুল দু ধরনেরই হতে পারে।


জেনেটিক ড্রিফট এর প্রভাব-

১. জেনেটিক ড্রিফট জনসংখ্যার জিনগত পরিবর্তনকে হ্রাস করে।

২. জেনেটিক ড্রিফট দ্রুত কাজ করে এবং ছোট জনসংখ্যার ক্ষেত্রে আরও বেশি ফলাফল দেয়। এই প্রভাব বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩.জেনেটিক ড্রিফট প্রজাতির জন্য অবদান রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছোট বিচ্ছিন্ন পপুলেশন জেনেটিক ড্রিফটের মাধ্যমে বৃহত্তর জনসংখ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।


 ১.১ পপুলেশন বটলনেক

পপুলেশন বটলনেক বলতে এককথায় বোঝায় মহাবিপর্যয়। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প, ধ্বংসাত্মক ঝড় কিংবা ব্যাপক সহিংসতা ইত্যাদির ফলে কোনো পপুলেশনের জিনপুলের তারতম্য দেখা দিতে পারে এমনকি প্রায় সম্পূর্ণ পপুলেশন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। পপুলেশন বটলনেক এর জন্য সৃষ্ট জেনেটিক ড্রিফট এলিল ফ্রিকোয়েন্সির ক্ষতিও করতে পারে।


যেমন ধরুন, কোনো পপুলেশনে মোট পাখি আছে ১০০ টা। এর মধ্যে ২৫ টা সাদা, ৩৫ টা ধূসর আর বাকি ৪০ টা হচ্ছে কালো রঙের। জিনোটাইপ ধরে নিলাম সাদা ( PP) ধূসর (Pp) কালো (pp)। একদিন কোনো এক বিপর্যয়ে ৩৫ টা ধূসর রঙের পাখি মারা গেল। এক্ষেত্রে কি হবে? Pp জেনোটাইপ টিকতে পারলো না সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে জন্মানো বংশধরদের মধ্যে কালো, সাদা রঙের পাখিই থাকবে। একেই পপুলেশন বটলনেক বলা হয়। কোনো এক বোতলে চার টি ভিন্ন রঙের ২০০ মার্বেল ঢুকিয়ে বোতলের মুখ খুলে ঝাকি দিলে চারটি রঙের মার্বেল মিশ্রিত হয়ে একসাথে নিচে পরার সম্ভাবনা খুবই কম বরং নির্দিষ্ট কোনো একটি রঙের মার্বেলের বাহিরে বের হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।

বটলনেক ইভেন্ট© Researchgate


তবে এখানেই শেষ না। পরবর্তীতে একেবারেই যে আর ধূসর রঙের পাখি আসবে না এমন কোনো কথা নেই। ডমিনেন্ট এলিল এবং রিসেসিভ এলিল মিশ্রিত হয়ে যদি পরবর্তীতে আবার হেটেরোজাইগাস হিসেবে ধূসর রঙের জন্য প্রয়োজনীয় জিনোটাইপ তৈরি করতে পারে তাহলে পরবর্তীতে ওই সাদা, কালো রঙের পাখিদের থেকেই পুনরায় ধূসর রঙের পাখি আসতে পারে। ফিনোটাইপ তো আসলে তিনটা সাদা, কালো এবং ধূসর। অবশ্য পপুলেশন বটলনেক এর মাধ্যমে কোনো পপুলেশন একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বা কোনো এক প্রকার জিনোটাইপ নির্মূল হয়ে যাওয়াটা একটু কঠিন। র‍্যান্ডমলি কোনো ট্রেইট তো আর একেবারে শেষ হবে না কমপক্ষে ৩-৪ টা হলেও থেকে যাবে। পরবর্তীতে ওই ৩-৪ টা থেকে পুনরায় কোনো পপুলেশন আসতে পারে অথবা কিছু প্রজন্ম পর ওই ৩-৪ টা একেবারে শেষ হয়ে যেতে পারে এবং বাকি থাকা পপুলেশন আলাদা প্রজাতি হিসেবে রিপ্রেজেন্ট হতে পারে। (১৬) 


১.২ ফাউন্ডার ইফেক্ট 

জেনেটিক ড্রিফট কি তা আমরা জানি। এ নিয়ে পূর্বে বিশদ আলাপ আলোচনা হয়েছে। পপুলেশন বটলনেক যেমন এক ধরনের জেনেটিক ড্রিফট ঠিক তেমনই আরেক ধরনের জেনেটিক ড্রিফট আছে যাকে বলে ফাউন্ডার ইফেক্ট। যখন কোনো পপুলেশন থেকে একদল লোক,যাদের এলিল ফ্রিকোয়েন্সি ওই টোটাল জনসংখ্যার এলিল ফ্রিকোয়েন্সিকে রিপ্রেজেন্ট করেনা, তারা যখন মাইগ্রেট করে অন্য স্থানে চলে যায় ও সম্পূর্ণ নতুন জনসংখ্যার উৎপত্তি ঘটায়, তখন নতুন জনসংখ্যার এলিল ফ্রিকোয়েন্সি আগেরটা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে,আর উভয় জনসংখ্যারই জেনেটিক ভ্যারিয়েশন বা জিন-বৈচিত্র কমে যায়, একেই বলে ফাউন্ডার ইফেক্ট।



 Image: biologos 


উদাহরণস্বরূপ, ধরে নিলাম কোনো পপুলেশন এ প্রায় ৫০০ লোক বাস করে। কোনো এক সময়ে সেখান থেকে ২০ জন লোকের একটা রোগ রয়েছে। ধরে নিচ্ছি রোগটার নাম ” ভালো লাগে তাই ভালোবাসি” সেক্ষেত্রে বাকি ৪৬০ জনের এলিল ফ্রিকোয়েন্সি আর ওই ২০ জনের এলিল ফ্রিকোয়েন্সি কিন্তু সেইম না। সেক্ষেত্রে ধরলাম ওই ২০ জন দূরবর্তী কোন এক দ্বীপে ঘুরতে গিয়ে আটকা পড়লো। পরবর্তীতে আর ফিরে আসতে না পেরে সেখানেই বসতি স্থাপন করে বসবাস করতে লাগলো এবং একসময় তাদের থেকেই প্রজন্মান্তরে একটি নতুন জনগোষ্ঠী গড়ে উঠলো যাদের প্রত্যেকের “ভালো লাগে তাই ভালোবাসি ” রোগ টা রয়েছে। যখন ওই ২০ জন ৪৬০ জনের সাথে বসবাস করতো তখন ২০ জনের এই বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য টা ছিলো কিন্তু ওই পপুলেশন ছেড়ে ভিন্ন এক পপুলেশন ক্রিয়েট করায় ২০ জনের নিজস্ব জনগোষ্ঠীতে ” ভালো লাগে তাই ভালোবাসি” রোগ টা থাকলেও আগের পপুলেশনে কিন্তু এই ট্রেইট না আর নেই। সুতরাং কি হলো? জিন ভ্যারিয়েশন আগের পপুলেশনে কমে গেল, এটাই ফাউন্ডার ইফেক্ট। মজার বিষয় হলো ডারউইনের পর্যবেক্ষণকৃত কচ্ছপ এবং গ্যালাপাগোস এএ ফিঞ্চ পাখির ক্ষেত্রেও এই ফাউন্ডার ইফেক্ট হয়েছিলো। (১৭)


১.৩ সিম্বায়োসিস 

সিম্বায়োসিস শব্দের উৎপত্তি গ্রীক দুটি শব্দ থেকে, যার অর্থ দাঁড়ায় “একসাথে থাকা”।

এটা হলো দুইটা ভিন্ন প্রজাতি বা একই প্রজাতির দুইটি জীবের মধ্যে একটা অন্তরঙ্গ আর লং-টার্ম বায়োলজিকাল ইন্টার‍্যাকশন। সিম্বায়োসিসে অংশগ্রহণকারী জীবদ্বয়কে বলে সিম্বায়োন্ট। অনেক ক্ষেত্রে সিম্বায়োন্টরা একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একসাথে বিবর্তিত হয়, এটাকে বলে কো-ইভোলুশন। (১৮)


প্রকারভেদঃ

সিম্বায়োসিস তিন প্রকারের।

প্যারাসাইটিজম (Parasitism)

এ সহাবস্থানে একটি প্রজাতি অন্য প্রজাতির দেহে বা দেহাভ্যন্তরে অবস্থান করে নানা প্রকার সুবিধা লাভ করে। এক্ষেত্রে যে প্রজাতি সুযোগ সুবিধা লাভ করে তাকে প্যারাসাইট বলে। প্যারাসাইট যে প্রজাতির দেহে অবস্থান করে সুযোগ সুবিধা লাভ করে তাকে হোস্ট বলে। এক্ষেত্রে প্যারাসাইট নানা সুযোগ সুবিধা লাভ করলেও হোস্টের ক্ষতি হয়। কখনো কখনো প্যারাসাইট কর্তৃক অত্যাধিক ক্ষতির কারণে হোস্ট মারা যায়। হোস্টের মৃত্যুর পর প্যারাসাইট নতুন হোস্টের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। যদি নতুন হোস্ট না পায়, তবে প্যারাসাইট মারা যায়। উদাহরণস্বরূপ : কৃমি ও মানবদেহের সহাবস্থান প্যারাসাইটিজম। এক্ষেত্রে কৃমি প্যারাসাইট ও মানবদেহ হোস্ট। কৃমি মানবদেহ থেকে শক্তি শোষণ করে নিজে উপকৃত হলেও মানবদেহের ক্ষতি সাধন করে।

কমেনসেলিজম (Commensalism)

এ সহাবস্থানে একটি প্রজাতি অন্য প্রজাতির দেহে অবস্থান করে নানা প্রকার সুযোগ সুবিধা লাভ করলেও হোস্টের কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সামুদ্রিক শার্ক ও রেমুরার মধ্যে বিদ্যমান সহাবস্থানের কথা। রেমুরা মাছ নিজেদেরকে তিমি বা হাংরের সাথে আটকে রাখে। পরে তিমি বা হাংরের উচ্ছিষ্ট খাবার খায় কিন্তু এতে তিমির কোনো ক্ষতি হয়না। এখানে রেমুরা উপকৃত হচ্ছে কিন্তু তিমির কোনো ক্ষতি বা লাভ হচ্ছে না।। এক্ষেত্রে যেহেতু শার্কের কোনো উপকার বা অপকার হয় না, তবে রেমুরার উপকার হয় তাই এ সহাবস্থানকে কমেনসেলিজম বলা হয়।

মিউচুয়ালিজম (Mutualism)

এ সহাবস্থানে উভয় প্রজাতিই একে অপর কর্তৃক উপকার লাভ করে ও কারোরই ক্ষতি হয় না। বরং এমন কিছু সহাবস্থান রয়েছে যারা আসলে একটি প্রজাতি হিসেবে কল্পনাই করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে লাইকেনের কথাই আনা যাক। শৈবাল ও ছত্রাক নামের দুইটি ভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে সহাবস্থানে থাকে। এ সহাবস্থানে থাকাকালে শৈবাল ছত্রাক উভয়ে একে উপরের উপকার করে তবে কোনো প্রকার অপকার করে না। তাই লাইকেনের এ সহাবস্থানকে মিউচুয়ালিজম বলা হয়।. দুটি প্রাণিই একে অপরের কাছে থেকে উপকৃত হয়। আবার কুমির হা করে থাকে আর পাখি তার দাত থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার খায়। আবার জেব্রার পিঠে উঠে পাখি তার চামড়ার ভিতর থেকে ছোটপোকা খায়। এটাও মিউচুয়ালিজমের উদাহরণ।

পরবর্তী অংশে আমরা ফিক্সেশন এবং স্পেশিয়েশান বা প্রজাতিরউদ্ভব কিভাবে হয় তা নিয়ে জানবো তাহলেই ম্যাক্রো ইভোলিউশন নিয়ে আমাদের কাজ আপাতত শেষ। ইন শা আল্লাহ। 


রেফারেন্স:


 ১৫.https://academic.oup.com/genetics/article/194/1/235/6065395?login=false

১৬.William R. Catton, Jr. “Bottleneck: Humanity’s Impending Impasse” Xlibris Corporation, 2009. p.290

১৭. Lee, C. E. (2002). Evolutionary genetics of invasive species. Trends in ecology & evolution, 17(8), 386-391.

১৮. Douglas, Angela (2010), The Symbiotic Habit, New Jersey: Princeton University Press, p. 5




Comments

Popular

ইনফিনিট রিগ্রেস - অসীমের দিকে প্রত্যাবর্তন