মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়:৩
মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়:৩
১. মিউটেশন বা পরিব্যক্তি
কোষের DNA মলিকুলের ভাংগন বা স্থান পরিবর্তনকে মিউটেশন বলে।মিউটেশনের ফলেই DNA সিকোয়েন্স ভেংগে যায়।কোন কোন সময় এর নিঊক্লিওটাইডগুলো এক স্থান হতে অপরস্থানে সরে গিয়ে মিঊটেশন ঘটায়।এ ভাংগন মুলত বাহ্যিক কারন যেমন রেডিয়েশন অথবা রাসায়নিক কারনেই হয়ে থাকে।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন বেশিরভাগ মিউটেশনই প্রানীদেহের জন্য খারাপ।এটা বিজ্ঞানে একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে মিউটেশন প্রানীদেহের ক্ষতিসাধন করে। মিউটেশন বা পরিব্যক্তি সংঘটিত হলে তা জিনের উপাদানে পরিবর্তন ঘটায়, অথবা জিনের কার্যক্রমে বাধাদান করে, অথবা কোন প্রতিক্রিয়াই ঘটে না। ড্রসোফিলা মাছিতে করা গবেষণার উপর প্রস্তাব করা হয়েছে যে, মিউটেশনে যদি জিন কর্তৃক সৃষ্ট প্রোটিনে পরিবর্তন আসে, তবে তা ক্ষতিকারক হতে পারে, যেখানে উক্ত মিউটেশনের ৭০ শতাংশেই ক্ষতিকারক প্রভাব থাকে, এবং বাকি অংশ নিরপেক্ষ বা সামান্য উপকারী হতে পারে। (১২)
মিউটেশন ছবিঃ genome.gov
মিউটেশন সাধারণত পাঁচ ধরনের হয়। যথা:
১. Insertion অন্তর্যোজন, Deletion/অপনোদন ( এখানে কোন ডিএনএ এর ভিতরে অন্য কোন নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্সের প্রবেশ ঘটে অথবা কোন নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্স বাদ পড়ে যায়)
২. Duplication (এখানে কোন নিউক্লিওটাইড সিকুয়েন্সের অনুরূপ কপি তৈরি হয় এবং ডি এন এর সাথে জুড়ে যায়)
৩. Translocation বা পরা-স্হানান্তর: এখানে দুইটি ডিএনএ স্ট্যান্ড এর মধ্যে কোন নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্সের অংশ বিনিময় হয়।
৪. Inversion: এখানে একটি নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্স ভেঙে যায় এবং সে পূর্বে যে অবস্থায় ছিল ঠিক তার বিপরীত অবস্থায় পুনরায় ডি এন এ এর সাথে লেগে যায়।
৫. Nondisjunction: মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোম সমুহ যদি ঠিক ভাবে আলাদা হতে না পারে তখন এ ধরনের প্রকরণ দেখা যায়।
৬. ফ্রেমশিফট (Frameshift) : জীবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রোটিনের সাংকেতিক লিপি হল ‘জিন’ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিন ডিএনএ’তে অবস্থিত, কিছু ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরএনএ’তে); যা জীবের বংশগতির একর। একেকটি ‘জিন’ একেকটি প্রোটিনের সাংকেতিক লিপি। কয়েকটি ‘কোডন’ মিলে জিন গঠিত। কোডন হচ্ছে তিনটি নাইট্রোজেনঘটিত জৈবক্ষার (hase)-এর মিলিত রূপ যেমন ACE কিংবা GCA একেকটি কোডন (উদাহরণস্বরূপ ACT কিংবা GCA) একেকটি অ্যামিনো অ্যাসিডের সাংকেতিক লিপি; আবার একাধিক কোডন দ্বারা একই অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। যাহোক, ডিএনএ অনুক্রমে সন্নিবেশন (Insertion) বা বিলোপন (Deletion) ঘটলে কোডনের গঠনে পরিবর্তন আসে, অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিবর্তন হয় এবং এতে জিনের নির্দিষ্ট কার্যক্রমেরও বদল ঘটে। একে ফ্রেমশিফট মিউটেশন বলে।
মিউটেশনের কারণঃ
মিউটেশন নানা কারণে হতে পারে, যেমন ডিএনএ তে ডুপ্লিকেশনের সময় একই ধরনের অন্য কপি তৈরি হতে পারে, আয়নাইজিং বিকিরণ যেমন গামা বিকিরণের ফলে মিউটেশন হতে পারে, আবার আল্ট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন এর ফলে ডিএনএ- তে দুটি নিউক্লিওটাইড থাকা সাইটোসিন এবং থাইমিন এর বেইস পরিবর্তিত হয়ে মিউটেশন হতে পারে। মিউটেশন মূলত ২ প্রকারের। (১৩)
ক্রোমোজোমাল মিউটেশনঃ ক্রোমোজোমাল অংশের পুনরাবৃত্তি বা ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত অংশের উপস্থিতিতে একটি ক্রোমোজোমের ভাঙা টুকরো একটি হোমোলোগাস বা নন-হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের সাথে সংযুক্ত হতে পারে যাতে কিছু জিন সমস্ত ক্রোমোসোমাল অঞ্চলের একাধিক কপিতে থেকে যেতে পারে।
ইন্টারস্টিশিয়াল ডিলিশন: একটি ইন্ট্রা-ক্রোমোসোমাল ডিলিটেশন এখানে ক্রোমোজোম থেকে ডিএনএর একটি অংশকে সরিয়ে দেয়, যার ফলে পূর্বের দূরবর্তী জিনগুলিকে প্রকাশ পায়। ক্রোমোসোমাল ট্রান্সলোকেশন : এক্ষেত্রে ননহোমোলোগাস ক্রোমোজোম থেকে জেনেটিক অংশের আদান-প্রদান হয়।
জিন মিউটেশন– এখানে জিনের রূপ পরিবর্তন হয়। ফলে, জিনটা ভিন্ন প্রোটিন উৎপাদন করা শুরু করে। এটাও কয়েকভাবে হয়, সাবস্টিটিউশনে দুইটা ভুল বেস জোড়া লেগে যায়, ইনসার্শনের একটা অতিরিক্ত বেস চলে আসে আর ডিলেশনে একটা বেস বাদ হয়ে যায়। এভাবে জিনের মধ্যে ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে দিয়ে মিউটেশন চলতে থাকে।
মিউটেশন প্রাণীদেহের দু জায়গায় হতে পারে। ১. জননকোষে ২. দেহকোষে
জননকোষে মিউটেশন
পিতা-মাতার গ্যামেট তৈরি হওয়ার সময় ( মিয়োসিস বিভাজনের সময়) মিউটেশন হতে পারে। গ্যামেট মিলিত হওয়ার পর জাইগোটে ক্রোমোজোম জোড়া লাগবে, সেখানে মিউটেটেড ক্রোমোজোম বা জিন আছে,ফলে পরবর্তী যতগুলো কোষবিভাজন হবে,প্রত্যেক কোষে ওই মিউটেটেড ক্রোমোজোমের কপিই থাকবে। ফলে, সন্তান যখন আবার বংশবৃদ্ধি করবে, তার দেহ থেকে যে ক্রোমোজোমগুলো যাবে, সেখানে উক্ত মিউটেটেড ক্রোমোজোম চলে যাবে। আর মিউটেশনর ফলে যে ভিন্ন এলিল তৈরি হয়েছিলো, সেটা ডমিনেন্ট হলে সেই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে। একে বলে জার্মলাইন মিউটেশন, যেটা জাইগোট তৈরির আগে হয়। এই মিউটেশনের ফলে সাধারণত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে থাকে।
দেহকোষে মিউটেশন
দেহকোষে মিউটেশন ঘটলে তাকে বলে সোমাটিক মিউটেশন। এটা জাইগোট তৈরির পরে, দেহকোষে হয়। যেমন ক্যান্সার হলে প্রথমে একটা একটা কোষে হবে, তারপর সেই ডিএনএ নিজের কপি তৈরি করবে ও ক্যান্সার ছড়িয় দেবে। কিন্তু সারা দেহের সব কোষে যেহেতু এই মিউটেশন হয়নি তাই এই মিউটেটেড জিন বংশপরম্পরায় অন্য কারো কাছে চলে যাবেনা। মূল দেহকোষে আগে থেকেই ক্রোমোজোমে সব তথ্য রয়ে গেছে, সেখানে কিছু পরিবর্তন হয়নি। ফলে সন্তান উৎপাদনের সময় ক্যান্সারের তথ্যওয়ালা জিন গ্যামেটে যাবেনা।
২. জিনের প্রবহণ
জিন ফ্লো বা জিন প্রবাহ বলতে বোঝায় কোনো পপুলেশনে জিনের নিয়মিত প্রবাহ বা এলিলের প্রবাহ। কোনো পপুলেশনে এক প্রজাতির জিনপুল অন্য প্রজাতিতে প্রবাহিত হওয়া কিংবা এক দলের জিনপুল ধীরে ধীরে অন্য দলে জিন প্রবাহিত হয়ে মিলে গিয়ে একক প্রজাতি হয়ে যাওয়া এগুলোকেই জিন ফ্লো বলা হয়। জনসংখ্যার মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য স্থানান্তরের জন্য জিন প্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কোনো পপুলেশনে জিনপ্রবাহের মাধ্যমে জিনগত বৈচিত্র্য তৈরি করে দুটো আলাদা প্রজাতি গড়ে উঠতে পারে আবার কোনো পপুলেশনে জিনপ্রবাহের মাধ্যমে আলাদা প্রজাতির ( জিনগতভাবে) সাথে জিনপ্রবাহ করে আদান প্রদানের মাধ্যমে একক প্রজাতিতে পরিণত হতে পারে। (১৩)
থট এক্সপেরিমেন্টঃ
আমরা পুনরায় আমাদের থট এক্সপেরিমেন্ট এ ফিরে যাই। আজ আমরা ফিঞ্চ নিয়ে কাজ করব। মাঝারি সাইজের ফিঞ্চ ( Geospiza fortis) পাখির একটি পপুলেশন আছে। এই পপুলেশনের সব পাখি একে অন্যের মধ্যেই প্রজনন ঘটায় অর্থাৎ একই জিন আদান প্রদান করে। এক্ষেত্রে এরা একটি প্রজাতি হিসেবে স্বতন্ত্র এবং মৌলিকত্ব ধরে রেখেছে। যেহেতু তারা বাহিরের কোনো পাখির সাথে প্রজনন করছে না সেহেতু তারা একক প্রজাতি হিসেবে তাদের জিনপুল কে বিশুদ্ধ রাখছে।
ধরে নেই কোনো এক অজানা কারণে ওই ফিঞ্চ পাখিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। ফলে কি হলো সেই পপুলেশনের পাখিদের মধ্যে দুটো ভাগ হয়ে গেল। x এবং y. দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ফিঞ্চ পাখির x অংশ y অংশ থেকে দূরবর্তী কোনো স্থানে মাইগ্রেট ( অভিবাসন) করলো। ফলে দুই প্রজন্ম পরে দেখা গেল x অংশ আর y অংশের সাথে প্রজনন করছে না। এবং y অংশ থেকে মাইগ্রেট করায় x অংশ এখন সম্পূর্ণ আলাদা। পরবর্তী প্রজন্ম থেকে x অংশ নিজেদের ভাগের পাখিদের সাথেই প্রজনন করা শুরু করলো। এতে কি হলো? তাদের মধ্যে আলাদা জিন প্রবহন শুরু হলো y অংশের পাখিদের তুলনায় ভিন্ন মিউটেশন হওয়া শুরু হলো। অপরদিকে y অংশের পাখিদের সাথেও অনুরুপ হতে লাগলো, দাড়াও নিজেদের অংশের পাখিদের সাথে প্রজনন শুরু করলো, তাদের মধ্যেও আলাদা মিউটেশন হতে শুরু করলো। বেশ কিছু প্রজন্ম পর দেখা যাবে একই পাখি আর তাদের নিজেদের মধ্যে প্রজনন করতে পারছে না। করলেও ফার্টাইল অফস্প্রিং ( প্রজননক্ষম সন্তান) জন্ম দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থাৎ তারা দুটো ভিন্ন প্রজাতিতে পরিণত হবে তাদের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে। একই প্রজাতির মধ্যে জিনের আদান প্রদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে জিন ভ্যারিয়েশন বাড়তে থাকলো। (১৪)
দ্বিতীয় অংশঃ
এবার ধরে নেই, x অংশের ৯০% পাখি y অংশের ৯৫% পাখির সাথে প্রজননে অক্ষম এবং ফার্টাইল বাচ্চা প্রদানের ক্ষমতা হারিয়েছে। তবে x অংশের ১০% এবং y অংশের পাখিদের ৫% এখনো চাইলে নিজেদের মধ্যে প্রজনন করতে পারবে। কোনো কারণে x এবং y পাখিদের একাংশ পুনরা প্রজনন করা শুরু করলো। ফলে কি হবে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে আবার জিনের আদান প্রদান শুরু হবে, একই মিউটেশন একে অপরের মধ্যে পাস হতে থাকবে এবং ধীরে ধীরে এরা পুনরায় একক প্রজাতিতে পরিণত হবে। এভাবে জিন ফ্লো এর ফলে নতুন প্রজাতি গঠিত হলেও জেনেটিক ডাইভার্সিটি কমে যায়।
১২.https://www.pnas.org/doi/full/10.1073/pnas.0701572104
১৩. mutation | Learn Science at Scitable”. Nature. Nature Education.
Retrieved 24 September 2018.
১৪. R, Briscoe DA, Ballou JD (2002-03-14). Introduction to Conservation Genetics. Cambridge University Press.
.png)

Comments
Post a Comment