মাইক্রো ইভোলিউশন: পরিচয়:২
মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়:২
আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আজ এই পর্বে খুব বেশি লিখবো না। কারণ বেশি পড়লে বোরিং লাগবে। একটুখানি পড়ুন তাহলেই হবে।
১. সেক্সুয়াল সিলেকশনঃ ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশন
ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন এ আমরা সর্বদাই উপকারী বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছি। তবে প্রাণীদের মধ্যে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় এবং প্রতিকূল ট্রেইট ও দেখা যায় যা আদোতে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয় কিন্তু তবুও সেই বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে বিদ্যমান। প্রাণীদের মধ্যে এমন কিছু অপ্রয়োজনীয় ( Evolutionary valueless) বৈশিষ্ট্য থাকার কারণ হচ্ছে সেক্সুয়াল সিলেকশন বা যৌন নির্বাচন।
যৌন নির্বাচন প্রধানত দু ধরনের। ১. Intrasexual selection এবং ২. Intersexual selection.
Intrasexual selection বা অন্তঃলিঙ্গের নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই লিঙ্গের সদস্যদের মধ্যে একাধিক পুরুষ একজন স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করতে চায় বা সঙ্গমের জন্য প্রতিযোগিতা করে। একটা স্ত্রী পাওয়ার জন্য পুরুষে পুরুষে এই দ্বন্দ্বে সাধারণ শক্তিশালী পুরুষেরাই জয়লাভ করে। একে ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশন বা অন্তঃলিঙ্গীয় নির্বাচন বলা হয়।
যখন একই প্রজাতির দুটি পুরুষ একটি মহিলার সাথে সঙ্গম করার সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করে। লিঙ্গগত দিক থেকে দ্বিরূপ বৈশিষ্ট্য, আকার, লিঙ্গ অনুপাত, সামাজিক পরিস্থিতি, সবই পুরুষ-পুরুষ প্রতিযোগিতার প্রভাবে পুরুষের প্রজনন সাফল্য এবং নারীর সঙ্গী পছন্দের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বৃহত্তর পুরুষরা পুরুষ-পুরুষ দ্বন্দ্বে জয়লাভ করে। সব প্রজাতিতেই ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশন দেখা যায়। যার শক্তি বেশি, সে ই টিকে যায়। বিভিন্ন প্রাণীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গ, যেগুলো প্রতিযোগিতার সময় তাদের শক্তি প্রদর্শন করে যেমন-হরিণের শিং, Elephant Seal দের bulk বা ,Horned beetle নামের পোকাদের মুখের সামনে শিং এর মতো অংশ, এগুলো ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশনের উদাহরণ।
যৌন নির্বাচনে নির্বাচিত ময়ূরের পেখম ছবিঃ Google photo
পাখিদের মধ্যে ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশন
পাখিদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সঙ্গমের আচরণ লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃকামী নির্বাচন (স্ত্রী পছন্দ করে নির্বাচন করে) এবং ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশন , যেখানে একাধিক পুরুষেরা স্ত্রী সঙ্গীর সাথে সঙ্গমের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। উদাহরণস্বরূপ dunnock নামের একটা ইউরোপিয়ান পাখিকে ধরা যায়। পুরুষরা সঙ্গমের আগে স্ত্রীদের পরিপাকতন্ত্রের শেষের একটা বিশেষ ছিদ্র যেটা একইসাথে মলত্যাগ ও জনন-সম্বন্ধীয় নিঃসরণের কাজ করে সেই অংশটাতে চঞ্চু দ্বারা খোচাতে থাকে, পরবর্তীতে খোচানোর ফলে স্ত্রী নিজের cloaca কে প্রসারিত করে, প্রসারিত করার ফলে পূর্ববর্তী যে পুরুষ তার সাথে সঙ্গম করেছিলো, তার বীর্য সেখান থেকে বের হয়ে যায়, তারপর বর্তমান পুরুষটা তার সাথে সঙ্গম শুরু করে। আবার এক ধরনের প্যারাসাইট আছে, যাদের পুরুষরা সঙ্গমের পর স্ত্রীদের জননেন্দ্রিয়কে(genitalia) বিশেষভাবে বন্ধ করে দেয়, যেটা শুধু সে ই খুলতে পারে। ফলে অন্য পুরুষেরা তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারেনা যার ফলে অন্য পুরুষের প্রজনন করার সম্ভাবনা কমে যায়।
এভাবেই ইন্ট্রাসেক্সুয়াল সিলেকশনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির পুরুষদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য (দৈহিক শক্তি, শিং, bulk) টিকে থাকে। (৯)
২. সেক্সুয়াল সিলেকশনঃ ইন্টারসেক্সুয়াল সিলেকশন
Mate Choice বা ইন্টারসেক্সুয়াল সিলেকশন / আন্তঃলিঙ্গীয় নির্বাচন সেক্সুয়াল সিলেকশনের আরেকটি প্রকার। আন্তঃলিঙ্গের নির্বাচনে এক লিঙ্গের সদস্যরা (সাধারণত স্ত্রীরা) বিপরীত লিঙ্গের পুরুষদ সদস্যদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সঙ্গমের জন্য বেছে নেয়। মূলত পুরুষেরা যেসকল অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করে তা কিন্তু স্ত্রীদের পুরুষ নির্বাচনের ফলেই হয়ে থাকে।
handicap hypothesis: এই হাইপোথিসিস অনুযায়ী পুরুষের মধ্যে যে ক্ষতিকারক কিংবা অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য থাকে সেগুলো স্ত্রীদের কাছে ভালো লক্ষণ। পুরুষের ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট্য গুলোর দ্বারা নারী মনে করে যে হ্যাঁ এই পুরুষটাই আমাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে কিংবা এই পুরুষ আমার দায়িত্ব নিতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, মার্লিন নামক উত্তর গোলার্ধের এক ধরনের ছোট পাখি। যখন শিকারী পাখি এই ছোট পাখিকে শিকারের উদ্দেশ্যে ধরার চেষ্টা করে তখন এই পাখিটি গান শুরু করে যেখানে সে বলে শিকারী পাখিটি তাকে কখনোই ধরতে পারবে না এবং স্ত্রী পাখি এটাকেই তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ধরে নেয়। (১০)
runaway sexual selection: উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। পুরুষ ময়ুরের বড় পেখম, দেখতে বেশ সুন্দর রং-বেরঙের চোখের মতো নকশা, দেখতে আকর্ষণীয় লাগে বটে কিন্তু, ময়ুরের জন্য জিনিসটা খুব-একটা সুবিধার না বা প্রয়োজনীয় না। কারণ, পেখম বড় এবং উজ্জ্বল রঙের হওয়ার কারণে অনেক দূর থেকেই শিকারীদের চোখে ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু পুরুষ ময়ুরের এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই কিন্তু স্ত্রী ময়ুর পুরুষ ময়ুরকে পছন্দ করেছিল, পরবর্তীতে তাদের সঙ্গমে আরও অফস্প্রিং আসবে যার ফলে ময়ুরের এই পেখমের বৈশিষ্ট্য টা টিকে থাকবে। এই বৈশিষ্ট্যটার জন্যই পুরুষ ময়ুর নির্বাচিত হয়েছে এবং স্ত্রী ময়ুরের নির্বাচনের ফলেই এই বৈশিষ্ট্যটা টিকে থাকবে। এই ট্রেইট দুটো ক্রমান্বয়ে এই সিলেকশনের মাধ্যমে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পরে একেই বলা হয় runaway sexual selection.
Sexy son hypothesis: এই হাইপোথিসিস অনুযায়ী একটি পপুলেশনে বিদ্যমান সম্ভাব্য সকল পুরুষ সঙ্গীর মধ্যে একজন স্ত্রী সঙ্গীর সবচেয়ে আদর্শ পছন্দনীয় সঙ্গী হলো এমন সঙ্গী যে প্রজননে সর্বোচ্চ ভুমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বার সঙ্গম করতে পারে। মহিলাদের সঙ্গমের পছন্দের মধ্যে এটি অধিক সঙ্গমে সক্ষম পুরুষ সঙ্গী অধিক পছন্দনীয়। এ নিয়ে রিচার্ড ডকিন্স তার বই ” দ্য সেলফিশ জিন ” এ বলেন,
- এমন একটি সমাজে যেখানে পুরুষরা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একজন স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের জন্য , সেখানে একজন মা তার জিনের জন্য সবচেয়ে ভালো জিনিসগুলির মধ্যে একটি মনে করেন এমন একটি ছেলে তৈরি করা যে পালাক্রমে একজন আকর্ষণীয় পুরুষ হিসাবে পরিণত হবে। . যদি তিনি নিশ্চিত করতে পারেন যে তার ছেলে সেই সৌভাগ্যবান পুরুষদের মধ্যে একজন যারা বড় হওয়ার পরে সমাজের বেশিরভাগ সঙ্গম জয় করে, অর্থাৎ অধিক সঙ্গমে সক্ষম তবে তার প্রচুর সংখ্যক নাতি-নাতনি থাকবে।
অর্থাৎ এক্ষেত্রে স্ত্রী অধিক সঙ্গমে সক্ষম পুরুষ নির্বাচন করে ফলে পরবর্তীতে প্রজন্ম আরও অধিক সংখ্যক বেশি সঙ্গমে সক্ষম পুরুষ পেয়ে থাকে। (১১)
Sex and Genetic Shuffling
এছাড়াও জেনেটিক ভ্যারিয়েশনের ক্ষেত্রে সেক্স এবং রিকম্বিনেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানুষের-
১.জিনগুলি ক্রোমোজোম নামক ডিএনএর দীর্ঘ চেইনে অবস্থিত।
২. মানুষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম রয়েছে: প্রতিটি জোড়ার একটি অংশ মায়ের কাছ থেকে এবং অন্যটি পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। অনুরূপভাবে, আমাদের প্রতিটি জিনের দুটি সংস্করণ রয়েছে, একটি মায়ের কাছ থেকে এবং একটি পিতার কাছ থেকে আসে।
ডিম্বানু এবং শুক্রাণু মিলিত হয় এবং জাইগোট গঠন করে। ডিম্বানু লাল ক্রোমোজোম বহন করে, শুক্রাণু নীল ক্রোমোজোম বহন করে, জাইগোট একটি লাল এবং একটি নীল ক্রোমোজোম বহন করে। যদি মানুষ মায়ের কাছ থেকে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম এবং বাবার থেকে 23 জোড়া ক্রোমোজোম নিয়ে পুনরুৎপাদন করা হয় তবে শিশুর অনেক বেশি ক্রোমোজোম (46 জোড়া) থাকবে। তাই ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু স্বাভাবিক সংখ্যক ক্রোমোজোমের মাত্র অর্ধেক বহন করে। যার যখন ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু একত্রিত হয়, তখন শিশু স্বাভাবিক ২৩ জোড়া ক্রোমোজম পায়।
যদি বাবার নাক কিছুটা উচু হয় এবং মায়ের ভ্র যদি খানিক বড় হয়। তবে আমরা জানি বাবার ডমিনেন্ট এলিল নাক উচু হওয়ার জন্য দায়ী এবং মায়ের ক্ষেত্রে এডমিনে এলিল ভ্র বড় হওয়ার জন্য দায়ী। যদি রিকম্বিনেশনে এই দুই ডমিনেন্ট এলিল ক্রোমোজমে চলে যায় তবে পরবর্তীতে ছেলের ডমিনেন্ট এ এই দুই মিশ্রণ প্রকট হবে ফলে সন্তানের নাক কিছুটা উচু হবে এবং ভ্রু তুলনামূলক বড় হবে।
আজ এটুকুই। পরবর্তী অংশে আরও মলিকিউলার লেভেলে ভ্রমণে যাবো আমরা, মিউটেশন, জিন ফ্লো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
রেফারেন্স:
৯. Weir, Laura K. (2012-11-22). “Male–male competition and alternative male mating tactics influence female behavior and fertility in Japanese medaka (Oryzias latipes)”. Behavioral Ecology and Sociobiology. 67 (2): 193-203. https://link.springer.com/article/10.1007/s00265-012-1438-9
১০.https://link.springer.com/article/10.1007/BF00167747
১১.https://www.journals.uchicago.edu/doi/10.1086/283379
.jpeg)
Comments
Post a Comment