আস্তিকতা বনাম নাস্তিকতা কোনটা অধিক যৌক্তিক?

 অক্সফোর্ড ডিকশনারী অনুযায়ী ব্রড সেন্সে নাস্তিকতার সংজ্ঞা হলো অতিপ্রাকৃত কোনোকিছুর অস্তিত্বের প্রতি অবিশ্বাস, কিংবা স্রষ্টা বা ঈশ্বর আছে এই বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যাত করাই হলো নাস্তিকতা। নাস্তিকতা শুরুর আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের প্রি সক্রেটিয়ান ফিলোসফারদের হাত ধরে। যাদের মধ্যে ডেমোক্রিটাস, এপিকুরাস, সেক্সটাস এম্পেরিকাস, লুক্রেটিউস প্রমুখ দার্শনিকরা উল্লেখযোগ্য। এবং এরা প্রায় প্রত্যেকেই বস্তুবাদ লালন করতেন। নাস্তিক্যবাদের মূল ভিত্তি হলো Ontological Naturalism বা সত্ত্বাতাত্ত্বিক প্রকৃতিবাদ।

Created

Ontological Naturalism অনুযায়ী যা কিছু অস্তিত্বে বিদ্যমান এলিমেন্টস, প্রিন্সিপাল সবকিছুই কেবল বস্তুর সমষ্টি, বস্তু ব্যতীত কিছুই নয় এবং এগুলোকে বস্তু দ্বারাই ব্যাক্ত করা যাবে। অস্ট্রেলিয়ান দার্শনিক গ্রাহাম অপির মতে ন্যাচারালিজমের পক্ষে কথা বলা এবং নাস্তিকতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করা দুটোই এক যেহেতু মেটাফিজিক্যাল ন্যাচারালিজম আস্তিকতার বিপক্ষে কাজ করে। (১) মেটাফিজিক্যাল ন্যাচারালিজম বেশ বড়সড় একটি ডক্ট্রিন, এটাতে ফিজিক্যালিজম (ভৌতবাদ), ম্যাটেরিয়ালিজম (বস্তুবাদ) ইত্যাদি নানান মতবাদ রয়েছে যা প্রকৃতবাদের সমর্থক। এখানে জেনে রাখা ভালো, Naturalism এর অর্থ হলো যা কিছু বিদ্যমান সবকিছুই প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার যোগ্য অন্যদিকে Materialism এর অর্থ হলো জগতে যা কিছু আছে সবই বস্তু, কেবলই বস্তু। এই দুইয়ের তেমন কোনো পার্থক্য নেই যদিও। স্ট্রং নাস্তিকতাবাদ লালন করতে গেলে ন্যাচারালিজম কে এন্ডোর্স করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে বর্তমান সময়ে বছর তিনেক আগে নাস্তিক দার্শনিক স্টিফেন 'ল তার এক ফিলোসোফিক্যাল পেপারে দাবি করেন ' নাস্তিকতা ন্যাচারালিজমকে এন্টেইল করে এটি একটি বিভ্রান্তিকর দাবি। কারণ যে কেউ সাধারণভাবে সন্দেহ করতেই পারে যে দেবতারা কিংবা এঞ্জেল ইত্যাদির আসলেও কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা, এবং ন্যাচারালিজম কে এন্ডোর্স করার পেছনেও এই কারণই রয়েছে যে মানুষ সন্দেহ করে অতিপ্রাকৃত কিছু আসলেই আছে কিনা। আবার তার মতে তিনি ন্যাচারালিজম সম্পর্কে জানলেও এটার প্রতি তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই, কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, চেতনা, নৈতিকতা, মোডালস এসবের ব্যাখ্যা ন্যাচারালিজম কিভাবে দেয়? তিনি বলেন, এখানে তার উত্তর হবে তিনি জানেন না। (২) স্টিফেন 'ল মোটামুটি যা বলতে চেয়েছেন তা হলো নাস্তিক হওয়ার জন্য ন্যাচারালিজম কে এন্ডোর্স করার দরকার নেই বরং যেকেউ থিইজমের পক্ষে স্কেপ্টিক্যাল হতেই পারে, এখানে সমস্যা হলো কেউ যদি স্রেফ সংশয় পোষণ করে তবে তাকে নাস্তিক বলার তুলনায় স্কেপ্টিক বা সংশয়বাদী বলা চলে, আবার কেউ যদি তার ওয়ার্ল্ডভিউ কে ডিফেন্ড করতে গিয়ে আমি জানিনা বলে অজ্ঞতা প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে সে অজ্ঞয়বাদীর ভুমিকা পালন করলো। মূলত স্টিফেনের পেপারে তিনি অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিকতা অর্থাৎ এগনোষ্টিক এথিজমের কথা বলেছেন যা সত্যিকার অর্থে নাস্তিকতা নয়, স্ট্রং এথিজম তো নয়ই। সুতরাং একজন নাস্তিককে প্রপার নাস্তিক হওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে তাকে ন্যাচারালিজম এন্ডোর্স করতেই হবে। ফিলপেপার সার্ভের ( পৃথিবীব্যাপী দার্শনিকদের মতামত দর্শনের বিভিন্ন শাখার উপর) ২০২০ এর রেজাল্ট অনুযায়ী অল এরাউন্ড সকল ফিল্ড মিলিয়ে নাস্তিক দার্শনিকদের মধ্যে অন্টোলজিক্যাল ন্যাচারালিজম এন্ডোর্স করা নাস্তিক প্রায় ৪৯.৮% ( ৩)


নাস্তিকতার ভিত্তি হিসেবে যে জিনিসটি ব্যবহৃত হয় তা হলো অন্টোলজিক্যাল ন্যাচারালিজম। যেহেতু নাস্তিকদের প্রিসাপোজিশন হলো সকল কিছুই বস্তু এবং সকল কিছুকেই প্রাকৃতিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে সেহেতু তারা আস্তিকদের কাছে তাদের পূর্বানুমিত 'প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা' র বাইরের প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা (আল্লাহর) র প্রমাণ দাবি করে। তবে যেহেতু তাদের প্রস্তাবিত ন্যাচারালিজম সেল্ফ রিফিউটিং বা স্ববিরোধী সেহেতু সকল কিছুর ব্যাখ্যা স্রেফ 'প্রাকৃতিক' এই কথার কোনো ভিত্তি নেই। ন্যাচারালিজম এর অর্থ কি? সকল কিছুই বস্তু সকল কিছুকে প্রকৃতি দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব, বস্তুবাদী ওয়ার্ল্ডভিউতে বিশ্বাস বলে কোনো কিছু থাকা সম্ভব নয় অথচ তাদের এই ন্যাচারালিজম কিন্তু একটি বিশ্বাস। আমরা এটাকে বলতে পারি self referentially objection. ন্যাচারালিজম অনুযায়ী যা কিছু অস্তিত্বে আছে সবকিছুই ন্যাচারাল অথচ বস্তুবাদ বা প্রকৃতিবাদ এই 'বাদ' বা বিশ্বাস কিন্তু বস্তু না। অর্থাৎ তাদের মতবাদ এবং এর সংজ্ঞা দুটো কন্ট্রাডিক্টরী যার ফলে ন্যাচারালিজম counterintuitive, self refuting.  



নাস্তিকদের পক্ষ থেকে আস্তিকদের বিপক্ষে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলা হয় তা হলো বার্ডেন অফ প্রুফ। যেহেতু আস্তিকরা দাবি করে থাকে যে একজন অতিপ্রাকৃত স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে সেহেতু আস্তিকদের কেই এটা প্রমাণ করতে হবে। সেই বিখ্যাত বার্টান্ড রাসেলের টি-পটের এনালজির কথা মনে আছে? তার মতে কেউ যদি দাবি করে বুধ এবং বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথে এক বিশাল টি-পট রাখা আছে তবে যে দাবি করবে তাকে অবশ্যই প্রমাণ দিতে হবে নতুবা তার দাবি প্রমাণিত হবেনা। এক্ষেত্রে এই এনালজি টা sloppy একটা এনালজি। কেননা An universe without a tea pot আর An Universe without God দুটো সেইম এপিস্টেমিক ভ্যালু বহন করে না। আদোতে বার্ডেন অফ প্রুফ কি কেবল একজনের উপর? ধরুন আপনি এবং আপনার বন্ধু কোনো এক কেস স্টাডি তে গেলেন, গিয়ে দেখলেন একটি খুন করা হয়েছে, নানা ভাবে নানান সূত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এসব দেখে আপনার বন্ধু উপসংহারে আসলো এই মেয়েটির হাসব্যান্ড তাকে খুন করেছে আপনি বললেন না, না আমার বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই মেয়েটিকে তার বাবা খুন করেছে। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আমাদের অসংখ্য সূত্র দেয় তার মধ্য থেকে কোনটা সেরা ব্যাখ্যা সেটা বের করাটা আমাদের দায়িত্ব এক্ষেত্রে যদি একজন আস্তিক মহাবিশ্বের ব্যাখ্যার জন্য স্রষ্টাকে দাবি করে তবে তাকে এর পক্ষে যুক্তি প্রমাণ দিতে হবে এবং নাস্তিক যদি Godless Creation কে দেখাতে চায় তবে তাকে তার পক্ষে যুক্তি প্রমাণ দিতে হবে। 


যেহেতু নাস্তিকদের প্রিসাপোজিশন অন্টোলজিক্যাল ন্যাচারালিজম স্ববিরোধী এবং ভুল সেক্ষেত্রে Godless মহাবিশ্বের সম্ভাবনা অসম্ভব এবং যেহেতু বস্তুর বাহিরেও অস্তিত্ব থাকা সম্ভব সেহেতু একজন অতিপ্রাকৃত স্রষ্টার অস্তিত্বও সম্ভব। যার ফলে নাস্তিকতার তুলনায় আস্তিকতা বেশি সম্ভাব্য এবং যুক্তিসঙ্গত। 


রেফারেন্স: 

1.Oppy, Graham (2013). "chapter 4". In Bullivant, Stephen; Ruse, Michael (eds.). The Oxford Handbook of Atheism

2.Law, S. (2020). Naturalism versus theism is a false dilemma. Think, 19(56), 103-107.

3.Bourget, D., Chalmers, D. J., & Chalmers, D. (2023). Philosophers on philosophy: The 2020 philpapers survey. Philosophers' Imprint, 23(1).

Comments

Popular

ইনফিনিট রিগ্রেস - অসীমের দিকে প্রত্যাবর্তন