মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়: ১

 মাইক্রো ইভোলিউশন: মেকানিজম পরিচয়: ১

বিবর্তন! কথাটা শুনলেই আমাদের মানস্পটে ভেসে ওঠে ক্রমান্বয়ে অগ্রগতির দিকে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার একটি চার্ট যাকে বলা হয় মার্চ অব প্রোগ্রেস। তবে বিবর্তনকে আমরা যতটা সহজে দেখি বিবর্তন আদোতে কিন্তু ততটাও সহজ বিষয় নয়। আমাদের এবারের আলোচ্য বিষয় হলো মাইক্রো বিবর্তন। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় " বিবর্তন মানে হলো বংশপরম্পরায় এলিল ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন। " তবে এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে সমস্ত বিদ্যমান জীবের উৎপত্তি এটি মূলত সামগ্রিক বিবর্তনীয় বিজ্ঞানের আলাদা একটি বিষয়। আধুনিক সংজ্ঞানুযায়ী বিবর্তন ঘটে একই গণের মধ্যে। অর্থাৎ রিপ্রোডাক্টিভ আইসোলেটেড হয়ে কোনো প্রাণী আলাদা প্রজাতিতে পরিণত হলেও তা একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন ধরুন, ফিঞ্চ পাখি। ফিঞ্চ পাখিদের মধ্যে প্রজনন বিচ্ছিন্নতা হয়ে কিছু ফিঞ্চ অন্যদের সাথে মিলন নাও করতে পারে এবং অন্যান্য ফিঞ্চ এর তুলনায় এর বাহ্যিক গঠনাকৃতি ভিন্ন হতেও পারে তবে যাইহোক ফিঞ্চ পাখিই থাকবে তা সরিসৃপ হয়ে যাবে না। জীবের মধ্যে এই পার্থক্য ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমা হয়। আজ আমরা মাইক্রো বিবর্তন এর মেকানিজম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।  


১  বিবর্তনের বেসিকঃ ডিএনএ, জিন, এলিল ফ্রিকোয়েন্সি। 


একটি কোষের ভেতরে থাকা সবচেয়ে ক্ষুদ্র জেনেটিক ইউনিট হচ্ছে একটি একক ডিএনএ নিউক্লিওটাইড। একটি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড এর মধ্যে মোট তিনটি জিনিস থাকে।একটা sugar group , একটি phosphate group, এবং চারটি সম্ভাব্য nitrogenous base এর যেকোনো একটি। যেমন Adenine,Thymine, Guanine,Cytosine যেগুলো কে সংক্ষেপে ( A,T,G,C) বলা হয়। Suger group এ পাচটি কার্বন অনু ও একটি অক্সিজেন অনু থাকে। অন্যদিকে Phosphate group এর কেন্দ্রে একটি ফসফেট অনু থাকে এবং এর সাথে চারটি অক্সিজেন অনু সংযুক্ত থাকে।যেগুলো সবগুলোই নেগেটিভ চার্জড। DNA তে থাকা চারটি Nitrogenous base ও Suger group & phosphate group এর মতো একটি মলিকিউল। যেখানে একাধিক নাইট্রোজেন অণু থাকে। যা DNA তে base ( ক্ষার) হিসেবে কাজ করে। এই Nitrogenous base গুলোতে থাকা নাইট্রোজেন অণু গুলো অন্যান্য অনু যেমন কার্বন অনু, হাইড্রোজেন অনু, অক্সিজেন অনুর সাথে মিলিত হয়ে একটি চাকতির মতো কাঠামো তৈরি করে। চাকতির মতো এই কাঠামো গুলো একক এবং দ্বিপাক্ষিক ও হয়। 

Thymine (T) & Cytosine (C) হচ্ছে Single ring structure. 

Adenine (A) & Guanine (G) হচ্ছে Double ring structure. 

Sugar & phosphate group ডিএনএ র কাঠামোর মেরুদণ্ড গঠন করে। যা প্রতিটি DNA নিউক্লিওটাইড কে একটি দীর্ঘ একক ডিএনএ সুত্রে শ্রেণিবদ্ধ ভাবে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে। আর DNA base গুলো নির্ধারণ করে ডিএনএ সিকুয়েন্স বা ডিএনএ বিন্যাস। DNA র কেমিক্যাল প্রোপার্টি ডিএনএ র বেইজ গুলোর মধ্যে অর্থাৎ A,T, G,C এর মধ্যে বন্ধন তৈরিতে সহায়তা করে, যাতে করে দ্বৈত সুত্র সৃষ্টি করা যায়। এরপর এই A, T, C, G পরস্পর বসে ইনফরমেশন এনকোড করবে এবং সেই ইনফরমেশন অনুযায়ী প্রোটিন উৎপন্ন হবে। জীবের প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির সঙ্কেত সঞ্চিত থাকে সেই অংশগুলিকে বলা হয় gene বা জিন। মানুষের নানান বৈশিষ্টের জন্য দায়ী এই জিন। 

অ্যালিল হচ্ছে একটি জিনের দুটি অলটারনেটিভ ভার্শন (alternative version)। দুটি অলটারনেটিভ ভার্শন মানে পৃথক বৈশিষ্ট্যের দুটি জিন। অ্যালিল দুটি একইধর্মী (যেমন-TT) আবার বিপরীতধর্মী (যেমন-Tt) হতে পারে। একইধর্মী হলে অ্যালিল দুটি প্রকট। আর বিপরীতধর্মী হলে একটি প্রকট অ্যালীল (T) এবং অন্যটি প্রচ্ছন্ন অ্যালীল (t). এক্ষেত্রে প্রকট অ্যালিলটি প্রচ্ছন্ন অ্যালিলকে বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাধা দেয়।

 মানুষের দেহে একই বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী জিনের জন্য দুইটা এলিল থাকে। যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব, সেক্ষেত্রে মা থেকে একটা আসে এবং বাবা থেকে একটা আসে। জোড়া তৈরি হয়, 

   এলিল © উইকিপিডিয়া 

জোড়ায় একটা প্রকাশ পায়, অন্যটি প্রচ্ছন্ন থাকে। আবার জোড়ায় দুইটাই ডমিনেন্ট ( প্রকট) বা দুটোই রিসেসিভ ( প্রচ্ছন্ন) হতে পারে। আমার চুলের রঙ কালো। এখন চুলের রঙের জিন টি হচ্ছে MC1R। এবং চুলের কালো রঙের এলিল হচ্ছে B ( ডমিনেন্ট) আর বাদামীর জন্য এলিল হচ্ছে b ( রিসেসিভ) 

আমরা ডমিনেন্ট এলিলকে ইংরেজি ক্যাপিটাল লেটারে প্রকাশ করব এবং রিসেসিভকে প্রকাশ করব একই এলফাবেটের স্মল লেটারে। আমার চুলের কালো রঙের এলিলকে "বি" ধরলাম এবং এটাকে ডমিনেন্ট ধরে নিলাম ( আসলেও B এলিল টা ডমিনেন্ট) আর, b কে রিসেসিভ ধরে নিলাম। 

ডমিনেন্ট কালো এলিল B

রিসেসিভ বাদামী এলিল b 

একই জিনের জন্য দুইটা এলিল জোড়া লাগবে 

এই দুটো দিয়ে ৩ টা জোড়া বানানো যাবে। 

BB, Bb, bb এখানে আমরা এলিলের গঠনে তিনটা সম্ভাব্য ঘটনা দেখতে পারি। এই তিনটাকে বলা হয় "জিনোটাইপ"। জিনোটাইপ দুই প্রকার। হোমোজাইগাস আর হেটেরোজাইগাস। হোমোজাইগাস মানে একই,হেটেরোজাইগাস মানে আলাদা। ত BB, bb হলো হোমোজাইগাস। কিন্তু এদের মধ্যে B এবং b এই দুটো জিনিস আলাদা, তাই এদেরকে যথাক্রমে হোমোজাইগাস ডমিনেন্ট ও হোমোজাইগাস রিসেসিভ বলা হবে। এবং Bb হবে হেটেরোজাইগাস।

যাদের এলিল জোড়া হোমোজাইগাস,তাদের বলে হোমোজাইগোট। মানে,আমি যদি হোমোজাইগোট হই এর মানে মানে আমার দেহে একই এলিলের জোড়া আছে, BB অথবা bb।

আবার আমি যদি বলি আমি হেটেরোজাইগোট,মানে আমার দেহে এলিলের জোড়ায় দুইটা আলাদা এলিল, Bb আছে।

জোড়ায় যদি ডমিনেন্ট এলিল থাকে, সেক্ষেত্রে রিসেসিভ এলিল প্রচ্ছন্ন থাকবে এবং ডমিনেন্ট এলিল প্রকাশ পাবে। তবে জোড়ায় ডমিনেন্ট এলিল না থাকলে রিসেসিভ এলিল ই প্রকাশ পাবে, কারণ সেখানে রিসেসিভ এলিল ছাড়া আর কোনো এলিল নেই। 


আমরা জিনোটাইপ কি জেনে গিয়েছি। উপরে আলোচিত তিনটা জিনোটাইপের জন্য আমরা ফলাফল পেতে পারি দুইটা। 

BB=Bb=ফর্সা

bb= কালো

এই দুটো হলো "ফিনোটাইপ" অর্থাৎ জিনোটাইপের বাহ্যিক ফলাফল হলো ফিনোটাইপ।


এবার আমার গায়ের রঙ কি হবে তা জানার জন্য দেখতে হবে আমার পিতা মাতার জিন কেমন। জানা গেল, আমার পিতার জিনোটাইপ হলো bb ,মানে আমার পিতার হোমোজাইগোট, হোমোজাইগাস রিসেসিভ ধারণ করে।ফলে, আমার পিতার প্রকাশিত ফিনোটাইপ হলো শ্যামলা।আর আমার মায়ের জিনোটাইপ হলো Bb, অর্থাৎ আমার মায়ের হেটেরোজাইগোট, তিনি হেটেরোজাইগাস ধারণ করেন। এইবার,আমার পিতা মাতার এলিল মিক্সড হয়ে আমার গায়ের রঙ উৎপাদন হবে। এলিল মিক্স হওয়ার সম্ভাবনাঃ 

Bb X bb= Bb, Bb, bb, bb. অর্থাৎ এলিল মিক্সড হয়ে আমার হেটেরোজাইগোট হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% আর হোমোজাইগোট রিসেসিভ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। হেটেরোজাইগোট মানেই ডমিনেন্ট এলিল প্রকাশ পাবে। সুতরাং আমার হেটেরোজাইগোট এলিল Dd প্রকাশ পাবে অর্থাৎ আমি হবো ফর্সা।  


আমি এমনিতেও ফর্সা যাইহোক। 


আমরা এতক্ষণ এলিল সম্পর্কিত যা কিছু দেখেছি তা মোটামুটি নির্দিষ্ট প্রাণী বা ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে বুঝানো সম্ভব হলেও এবার নির্দিষ্ট প্রাণীর গণ্ডি থেকে বেরিয়ে চিন্তা করতে হবে। গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পপুলেশন তথা গোষ্ঠী পর্যায়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক। সহজ কথায় পপুলেশন কী জিনিস?

কোনো প্রজাতির একটা অংশ যা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় অবস্থান করে এবং নিজেদের মধ্যে যৌনমিলনের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম।

ধরি, কোনো একটি দ্বীপে ১০০০ জন মানুষ বাস করছেন বংশ পরম্পরায় । ঐ ১০০০ জন মানুষ নিয়ে একটি জাতিগোষ্ঠী বা পপুলেশন। তাদের গায়ের রঙের জন্য দায়ী জিনোটাইপ পরিমাপ করে জানা গেল

১) BB জিনোটাইপধারী মানুষ ৫০০ জন।

২) Bb জিনোটাইপ ধারী মানুষ ৫০০ জন।


তাহলে ঐ পপুলেশনে B অ্যালিলের ফ্রিকোয়েন্সি হবে ৫০০/১০০০= ০.৫ আবার t অ্যালিলের ফ্রিকোয়েন্সি হবে 

৫০০/১০০= ০.৫ 

তাহলে মোট অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি ০.৫+০.৫= ১ কোনো অ্যালিলের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ণয় করলে আমরা সর্বদা তা ০ থেকে ১ এর মধ্যেই পাব। (১) (২) তো এই গেল এলিলালাপ। এবার একটু অংক করা যাক।


২. বিবর্তন এর সহজ অঙ্কঃ হার্ডি ওয়েইনবার্গ ইকুইলিব্রিয়াম 


নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এই নীতি বিজ্ঞানী হার্ডি এবং ওয়াইনবার্গ প্রদান করেছেন। তাদের নীতি অনুসারে, কোনো পপুলেশনে অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি সর্বদা একই থাকবে। এর জন্য বিশেষ কিছু শর্তও রয়েছে।

১) পপুলেশনে কোনো প্রকার বিবর্তন ঘটবে না।

২) পপুলেশনের কোনো সদস্যের জিন সিকোয়েন্সে কোনো প্রকার মিউটেশন ঘটবে না।

৩) র‍্যান্ডমলি ব্রিডিং হবে।

৪) মাইগ্রেশনের কারণে বা কোনো দূর্যোগে পপুলেশনের সদস্য সংখ্যায় হঠাৎ পরিবর্তন আসবে না।

৫) পপুলেশন বা গোষ্ঠীর আকৃতি বড় হতে হবে, সদস্য সংখ্যা বেশি হতে হবে।

অংকঃ

হার্ডি ওয়াইনবার্গ নীতি থেকেই প্রতিপাদন করা যায় কোনো পপুলেশনের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য প্রকাশকারী অ্যালিলের ফ্রিকোয়েন্সি মোট ১ হবে। অর্থাৎ যদি ধরি p এবং q অ্যালিল নির্দিষ্ট জিনোটাইপ বহন করে তবে আমরা নিম্নোক্ত তিন ধরনের কম্বিনেশন পাওয়া যাবে।

তাহলে আগের অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সির মতো এখানে জিনোটাইপ ফ্রিকোয়েন্সি বের করে ফেলা যাক।

মোট কম্বিনেশন সংখ্যা=৪

p এর জিনোটাইপ ফ্রিকোয়েন্সি ১/৪=০.২৫

pq এর জিনোটাইপ ফ্রিকোয়েন্সি ২/৪=০.৫

q এর জিনোটাইপ ফ্রিকোয়েন্সি ১/৪= ০.২৫

তাহলে পপুলেশনের মোট জিনোটাইপ ফ্রিকোয়েন্সি

p²+2pq+q² = 1

বা (p+q)²=1

বা p+q=1

এইযে হিসাব করলাম এটা হার্ডি ওয়েইনবার্গের ফর্মুলা অনুযায়ী।

তাহলে সমাধান পেয়ে গেলাম আমরা। পপুলেশনের মোট অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি সর্বদা ১ ই হবে যে কোনো অ্যালিলকে বিবেচনায় আনলে।

সূত্র: বিসিবি


বিশ্লেষণঃ

কিন্তু আসলে হার্ডি ওয়াইনবার্গ নীতি প্রকৃতিতে খাটে না। মিউটেশন ঘটতে থাকে, ন্যাচারাল সিলেকশন চলতে থাকে, যে প্রজাতি যত বেশি ফিট হয় প্রকৃতিতে সে তত বেশি টিকে থাকার সুবিধা পায় । সেক্সুয়াল সিলেকশনেদ ফলে লম্বা পুরুষেরা তুলনামূলক লম্বা সঙ্গী চায়, খাটো পুরুষেরা নিজের তুলনায় খাটো সঙ্গী পছন্দ করে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে তেমন র‍্যান্ডম ব্রিডিং ঘটেনা। মূলত প্রকৃতিতে হার্ডি ওয়েইনবার্গ এর সমীকরণ সফল হয়না বা এই ইকুইলিব্রিয়াম এর কোনো শর্তই প্রকৃতিতে পূরণ হয়না। এর মানে হচ্ছে কোনো পপুলেশন আদোতে একইভাবে সবসময়ই স্টেবল থাকেনা বরং তার বিবর্তন ঘটতে থাকে, ট্রেইট পরিবর্তন হতে থাকে। আমরা তাহলে দেখলাম, হাড়ি-ওয়াইনবার্গের নীতি, যেখানে বলা হয়, কোনো বৃহৎ পপুলেশনের অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি সর্বদা নির্দিষ্ট থাকবে এর জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্তই লঙ্ঘিত হয়। সুতরাং বিবর্তন ঘটছে। (৩)


৩. প্রাকৃতিক নির্বাচন : ডায়রেকশনাল সিলেকশন

প্রাকৃতিক নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো জনগোষ্ঠীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এটি ডারউইনীয় বিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। যেকোন জনগোষ্ঠীতেই প্রাকৃতিকভাবে প্রকরণ উৎপন্ন হয়, এর ফলে কিছু কিছু প্রাণী টিকে থাকতে সমর্থ হয় ও প্রজননে অপেক্ষাকৃত বেশি সফল হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের বেশ কিছু প্রকার রয়েছে। সেগুলো নিয়ে এই অংশে আলোচনা করা হবে। 

হাইপোথিটিক্যাল পপুলেশনঃ 

বিষয়টি বোঝার সুবিধার্তে আমরা একটি খরগোশের পপুলেশন কল্পনা করে নেই। ধরলাম পপুলেশনে দু রকমের খরগোশ আছে। B এলিলধারী খরগোশ হচ্ছে বাদামী রঙের এবং b এলিলধারী খরগোশ হচ্ছে সাদা রঙের খরগোশ। ধরলাম বাজপাখি সাধারণত সাদা খরগোশ বেশি পছন্দ করে তবে বাদামী রঙের খরগোশ পছন্দ করে না। সেক্ষেত্রে বাজপাখি সাদা খরগোশগুলোকে খেয়ে ফেলবে এবং বাদামী রঙের খরগোশ টিকে যাবে। ফলে বাদামী রঙের খরগোশ প্রজননে বেশি অংশ নিতে পারবে এবং B জিনোটাইপ ওয়ালা খরগোশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ খরগোশের পপুলেশনে একটি পরিবর্তন ঘটবে সেটা কি? সেটা হচ্ছে উক্ত 

খগোশের পপুলেশনে B এলিল ফ্রিকোয়েন্সির সর্বোচ্চভাবে ধারণ করবে।

খরগোশের পপুলেশন চিত্রঃ উইকিপিডিয়া 


যারা বিবর্তন নিয়ে খানিক পড়াশোনাও করেছেন তাদের নিশ্চয়ই পেপার মথ নিয়ে জানাশোনা আছে। ওইযে ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের সময় বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। দেখা গেল, সেসব এলাকায় সাদা পেপার মথের চেয়ে কালো পেপার মথের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। জীববিদ জেমস টাট প্রস্তাব করেন, দূষণের কারণে গাছের কাণ্ড কালো হয়ে যাওয়ায়—কালো পেপার মথগুলো শিকারি পাখির চোখ এড়িয়ে গেছে, সাদাগুলো বেশি মারা পড়েছে। এভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে কালোরা প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। এই অনুকল্পকে পরীক্ষায় রূপ দেন বার্নার্ড ক্যাটেলওয়েল, তিনি দূষণযুক্ত ও দূষণমুক্ত গাছের কাণ্ডে সাদা ও কালো পেপার মথ ছেড়ে দেন। পরে কিছু পোকা সংগ্রহ করে দেখেন, দূষণযুক্ত এলাকায় কালো পেপার মথের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে মনে হচ্ছে। তবে এই পরীক্ষণ নিয়ে অনেকের একটা ভুল ধারণা রয়েছে, যে উক্ত ঘটনায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে , কিন্তু এই পরীক্ষায় নতুন কোনো প্রজাতি উদ্ভব হয়নি। স্রেফ বিরাজমান প্রজাতির মাঝে একজন সুবিধা পেয়েছে, যারা আগে থেকেই ওই এলাকায় ছিল। এ ধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচনকে ডায়রেকশনাল সিলেকশন বলা হয়।


৪. “স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশন” বা “প্রশমনকারী নির্বাচন”

স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশনে সবক্ষেত্রে সিলেক্টেড হয় “এভারেজ” বা মাঝারিরা। এই নির্বাচনে , মাঝারি বৈশিষ্ট্যধারীরা টিকে থাকবে বাকিরা মারা যাবে। মাঝারি বা এভারেজ ফিনোটাইপের এলিল ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি পাবে, সেটাই পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর হওয়ার সুযোগ বেশি পাবে, বাকিরা সেই সুযোগ পাবেনা।

আমরা কিছু উদাহরণ দেখতে পারি যেমন-

১/ গাছ যদি বেশি খাট হয় তবে সূর্যের আলো কম পাবে। বেশি লম্বা হলে ঝড়ের সময় হেলে পড়বে। দুদিক থেকেই ঠিক থাকার জন্য উপযুক্ত মাঝারি উচ্চতার গাছ।

২/ একটা প্রাণী শিকারের হাত থেকে বাঁচার জন্য তার চারপাশের পরিবেশের সাথে মিশে যেতে চাইবে তার গায়ের রঙের সাথে ম্যাচ করে, যাতে আশেপাশের রঙে তাকে আলাদা না করা যায়। যদি পরিবেশের সাপেক্ষে রঙ বেশি হালজা হয় তবে শিকারীর কাছে ধরা পড়বে। যদি রঙ বেশি গাড় হয় তাহলেও ধরা পড়বে। সুতরাং বেচে থাকবে মাঝামাঝি রঙের প্রাণীরা।

৩/ প্রাণীদের ক্ষেত্রে যদি প্রতিকুল পরিবেশে খুব বেশি বাচ্চা জন্ম দেয় তবে খাদ্যাভাবে কিংবা পুষ্টির অভাবে তারা মারা যাবে, যদি খুব বেশি কম হয় তবে সেই পপুলেশন টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রেও বেচে থাকার জন্য অর্থাৎ পপুলেশন টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হবে মাঝারি সংখ্যার জনসংখ্যা।

৪/ সাইবেরিয়ান হাস্কির ( স্লেজ কুকুর) স্লেজ টানতে এবং দ্রুত স্লেজ সরানোর জন্য এই কুকুরগুলির যথেষ্ট শক্তিশালী পেশী থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, তাদের তুষারের উপরে থাকার জন্য যথেষ্ট হালকা হতে হবে। সুতরাং হস্কির পায়ের পেশীগুলি তাদের শক্তি এবং ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখতে মাঝারি আকারের হলে সবচেয়ে ফিট থাকবে। (৪) (৫) 


স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশন চিত্রঃ khan academy


৫. ডিসরাপ্টিভ সিলেকশন। ( বিঘ্নিত নির্বাচন)


এই নির্বাচনটি এক কথায় স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশন এর একেবারে উল্টো। স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশন এ যেমন মাঝারি ধরনের ট্রেইট বা বৈশিষ্ট্য কে সিলেক্ট করা হয়, ডিসরাপ্টিভ সিলেকশন বা বিঘ্নিত নির্বাচনে হয় তার ঠিক উল্টো। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মাঝারি বা এভারেজ ট্রেইট কে বাতিল করে দেয়া হয় এবং কম কিংবা বেশি এলিল ফ্রিকোয়েন্সির ট্রেইট এই সিলেকশন এ সিলেক্ট হয় তবে মাঝারিটা হয়না।



হাইপোথেটিক্যাল খরগোশঃ

আমরা পুনরায় একটি খরগোশ নগর কল্পনা করে নেই। ধরে নিলাম সেই খরগোশের পপুলেশনে খরগোশের রঙ হচ্ছে কালো এর এলিল হচ্ছে B এবং জিনোটাইপ হচ্ছে BB আবার খরগোশের পপুলেশনে বাকি এক অংশের রঙ হলো সাদা এর এলিল হচ্ছে b এবং এর জিনোটাইপ হচ্ছে bb. এ তো গেল হোমোজাইগাস রিসেসিভ আর হোমোজাইগাস ডমিনেন্ট এর কাহিনি। এখানে একটা জিনিস বোঝা দরকার, পূর্বে আমরা বলেছিলাম অ্যালিল দুটি একইধর্মী (যেমন-BB) আবার বিপরীতধর্মী (যেমন-Bb) হতে পারে। একইধর্মী হলে অ্যালিল দুটি প্রকট। আর বিপরীতধর্মী হলে একটি প্রকট অ্যালীল (T) এবং অন্যটি প্রচ্ছন্ন অ্যালীল (t). এক্ষেত্রে প্রকট অ্যালিলটি প্রচ্ছন্ন অ্যালিলকে বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাধা দেয়। কিন্তু এখানে হেটেরোজাইগাসে বাধা দেয়ার মানে তো আর এইনা যে ডমিনেন্ট এলিল একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে বরং এ দুটো এলিলের রিসেসিভ ডমিনেন্ট কে প্রশমিত করে দিয়ে কালো এবং সাদা মিশে গিয়ে আরেক অংশ হেটেরোজাইগাস খরগোশের রঙ হবে ধূসর রঙের। এবং এর জিনোটাইপ হলো Bb. এবার ধরে নিলাম খরগোশের পপুলেশনে কালো এবং সাদা রঙের পাথর আছে বেশ বড় বড় তুলনামূলকভাবে লুকিয়ে থাকার মতো। সেক্ষেত্রে শিকারের সময় জিনোটাইপ BB অর্থাৎ কালো পশমের খরগোশ গুলো কালো পাথরের কাছাকাছি লুকাবে, এবং জিনোটাইপ bb অর্থাৎ সাদা রঙের খরগোশগুলো সাদা পাথরের কাছাকাছি লুকিয়ে পড়বে আর বাকি হেটেরোজাইগাস Bb অর্থাৎ ধূসর রঙের খরগোশ তাদের বাসস্থানে এবং সমতল অঞ্চলে চলাচল করবে ফলস্বরূপ এরা শিকারের সাথে সাথে কমতে থাকবে।

disruptiveness selection source: Learn With Fun

ডিসরাপ্টিভ সিলেকশন আমাদের হাইপোথেটিক্যাল খরগোশের চরম কম এবং বেশি ট্রেইট গুলো কে রেখে মাঝারি ট্রেইট টাকে বিঘ্নিত ভাবে সিলেক্ট করে এবং বাদ দিয়ে দেয়। (৬) 



৬. নেগেটিভ সিলেকশন বা নেতিবাচক নির্বাচন

নেতিবাচক নির্বাচন কোনো প্রজাতির ক্ষতিকারক এলিলগুলো সরিয়ে জৈবিক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যার ফলে নেতিবাচক নির্বাচনকে কখনও কখনও বিশুদ্ধকরণ নির্বাচন বা পটভূমি নির্বাচনও বলা হয় । নির্বাচনের এই রূপটি এত প্রচলিত হওয়ার একটি মূল কারণ হ’ল জৈবিক কাঠামোকে অপ্টিমাইজ করার ক্ষেত্রে বিবর্তনের সাফল্য, একটি সিস্টেমের উন্নতি হওয়ার সাথে সাথে একটি ক্ষতিকারক মিউটেশনের কিংবা ক্ষতিকারক এলিল দ্বারা সেই উন্নতি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশুদ্ধ নির্বাচন বা পিউরিফায়িং সিলেকশন ক্ষতিকারক মিউটেশন কিংবা ডিলেটেরিয়াস এলিলকে পপুলেশনে ছড়িয়ে পড়তে দেয়না।


আরেকটু ব্যাখ্যা:

আমরা জানি এলিল মূলত দুই ধরনের, ডমিনেন্ট আর রিসেসিভ। ডিলেটেরিয়াস এলিলের ক্ষেত্রেও তাই। ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিল, আর ডিলেটেরিয়াস রিসেসিভ এলিল। কারো মধ্যে যদি ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিল থাকে, তাহলে সে হোমোজাইগাস (BB) বা হেটেরোজাইগাস, (Bb) যেকোনো একটা হলেও ক্ষতিগ্রস্থ হবে অর্থাৎ ফিটনেস কমে যাবে। এক্ষেত্রে পপুলেশনে ধীরে ধীরে ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিলধারী প্রজাতির সংখ্যা কমতে থাকবে, আর ন্যাচারাল সিলেকশন একসময় এই ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিলকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু যারা ডিলেটারিয়াস রিসেসিভ এলিল তারা টিকে থাকবে এর কারণ হচ্ছে রিসেসিভ এলিল (b) হেটেরোজাইগাসে থাকলে তার সহাবস্থানকারী নন-ডিলেটারিয়াস ডমিনেন্ট এলিলের কারণে তা প্রকাশিত হতে পারেনা। তাই যারা হেটেরোজাইগাস, তাদের মধ্যে ডিলেটারিয়াস রিসেসিভ এলিল টিকে থাকবে। কিন্তু তাতেও প্রজাতির কোনো ক্ষতি হবেনা কেননা ডিলেটেরয়াস রিসেসিভ এলিল কে নন-ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিল প্রশমিত করে রাখবে। ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিলধারী পপুলেশনের ফিটনেস কমে যায়,ন্যাচারাল সিলেকশন ডিলেটেরিয়াস ডমিনেন্ট এলিল বিলুপ্ত করে দেয়। ডিলেটারিয়াস রিসেসিভ এলিল নেগেটিভ সিলেকশনের মাধ্যমে বিলুপ্ত হবে এবং টিকে থাকবে কেবল হেটেরোজাইগাস। (Bb) এক্ষেত্রে যা হচ্ছে তা হলো দুটো চরম হোমোজাইগাসের বিরুদ্ধে সিলেকশন এবং মাঝারি হেটেরোজাইগাসের পক্ষে সিলেকশন আমরা পূর্বেও এমন কিছু লক্ষ্য করেছি, এটা হচ্ছে পিউরিফায়িং সিলেকশনের ফলে ঘটা স্ট্যাবিলাইজিং সিলেকশন বা ভারসাম্যপূর্ণ নির্বাচন। (৭) (৮)


পরবর্তী অংশে সেক্সুয়াল সিলেকশন, জেনেটিক সাফলিং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। হ্যাপি রিডিং। শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিন। ধন্যবাদ। 


রেফারেন্স:

১. Hartl, Daniel L.; Elizabeth W. Jones (2005). Essential genetics: A genomics perspective (4th ed.). Jones & Bartlett Publishers. p. 600

২.Allele. Genome.gov. Archived from the original on 28 June 2021. Retrieved 3 July 2021.

৩. Hartl DL, Clarke AG (2007) Principles of population genetics. Sunderland, MA: Sinauer

 ৪. A Simple Definition and Prominent Examples of Stabilizing Selection”. BiologyWise. Retrieved 2018-05-16.

৫. “Stabilizing Selection”. www.brooklyn.cuny.edu. Retrieved 2018-05-13

৬. Doolittle, Donald (1987). Population Genetics- Basic Principles. Germany: Springer-Verlag. pp. 69–

৭.Burch, C. L., & Chao, L. Evolution by small steps and rugged landscapes in the RNA virus phi6. Genetics 151, 921–927 (1999)

৮.Charlesworth, D., et al. The pattern of neutral molecular variation under the background selection model. Genetics 141, 1619–1632 (1995)


Comments

Popular

ইনফিনিট রিগ্রেস - অসীমের দিকে প্রত্যাবর্তন