স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণের দায় এবং নাস্তিকতার যৌক্তিকতা

 জগতের কিছু মানুষ বিশ্বাস করে স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে। এমন কেউ রয়েছেন যিনি আল্টিমেটলি আমাদের এই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। এই মতবাদকে আস্তিক্যবাদ বলা হয়। অন্যদিকে এর বিপরীতকে বলা হয় নাস্তিক্যবাদ। নাস্তিক্যবাদ অনুযায়ী কোনো স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই কিংবা কোনো অতিপ্রাকৃত সত্ত্বার অস্তিত্বই নেই। আস্তিক নাস্তিক ডিসকোর্সে বেশ প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে বার্ডেন অফ প্রুফ কার জন্য হবে। বেশ কিছু নাস্তিক মনে করে থাকে' স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই ' এই বাক্যটি সত্য কারণ স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। আসলেই কি তাই? 

বিষয়টা গোড়া থেকে বোঝা যাক। স্রষ্টার অস্তিত্বের জন্য বার্ডেন অব প্রুফ বা সর্বদাই আস্তিকদের উপর কিছু ক্ষেত্রে এ কথা সত্য। তবে 'স্রষ্টা অস্তিত্ব নেই' কারণ তাঁর অস্তিত্বের জন্য প্রমাণ নেই এটি ভুল।


১. Burden of proof [ প্রমাণের দায়]

বার্ডেন অব প্রুফ [ ল্যাটিনে: onus probandi] মূলত একটি থিসিস যা বলে যে কোনো কিছু দাবি করবে প্রমাণ করার দায়িত্ব তার উপর বর্তাবে। কোনো কিছু দাবি করলে তার সত্যতা প্রমাণ ও দাবীকারীকেই প্রোভাইড করতে হবে। কোনো ডিসকাশনে একজন ব্যক্তি যদি কোনো কিছু দাবি করে তবে তাকে সেটা প্রমাণ ও করতে হবে এটাই মূলত ব্যক্তির বার্ডেন অব প্রুফ বা প্রমাণের দায়। (১) নব্য নাস্তিক ক্রিস্টোফার হিচেন আরেকটু আগ বাড়িয়ে তার 'Hitchen's razor এ বলেছেন, ' প্রমাণ ব্যতীত কোনো কিছু বলা হলে প্রমাণ ছাড়াই সেটাকে বাতিল করে দেয়া উচিত '। (২) বার্ডেন অব প্রুফ অনেক ক্ষেত্রে আর্গুমেন্ট ফ্রম ইগ্নোরেন্স ফ্যালাসির মাধ্যমে শিফট করার চেষ্টা করা হয়, আর্গুমেন্ট ফ্রম ইগ্নোরেন্স বা অজ্ঞতার যুক্তি হলো এমন যে, কোনো প্রপোজিশনকে সত্য মনে করা যেহেতু তা মিথ্যে প্রমাণিত হয়নি কিংবা কোনো কিছুকে মিথ্যে মনে করা যেহেতু তা সত্য প্রমাণিত হয়নি। উদাহরণস্বরুপ, কেউ যদি বলে স্রষ্টার অস্তিত্বের বিপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই তাই, স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে। এটি অজ্ঞতার যুক্তি থেকে 'স্রষ্টার অস্তিত্বের জন্য প্রমাণ' কে শিফট করার চেষ্টা যা একটি কুযুক্তি। অনেক ক্ষেত্রে বার্ডেন অব প্রুফ কে একাংশ বৃদ্ধি করতে বলা হয় যে নেগেটিভ কোনো কিছু অর্থাৎ বাতিল কোনো কিছু কিংবা কোনো অনস্তিত্ব (non existence) কে আসলে 'প্রমাণ' করা সম্ভব না, সেজন্য স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে যারা বলে, প্রমাণের দায় কেবল তাদের জন্যই।

 এক্ষেত্রে এস্ট্রোফিজিসিস্ট মার্টিন রীস এবং কার্ল সাগানের একটি উক্তি রয়েছে ' absence of evidence Isn't evidence of absence. অর্থাৎ কোনো কিছুর প্রমাণ না থাকাটা সেই বস্তুর 'না থাকার' প্রমাণ হতে পারে না। বিখ্যাত বার্টান্ড রাসেলের 'টি পট' এনালজির কথাই চিন্তা করুন। রাসেলের মতে, কেউ যদি দাবি করে সৌরজগতের কোনো দুটো গ্রহের মধ্যে একটি চায়ের কাপ রাখা রয়েছে তাহলে দাবীকারী কে এটার জন্য প্রমাণ দিতে হবে, অর্থাৎ প্রমাণের দায় দাবি যে করবে তার জন্য বর্তাবে। তবে কেউ যদি এমন দাবি করার পর প্রমাণ না দিতে পারে তাহলেই কি প্রমাণ হয়ে যায় যে 'টি পট' টি আসলেই নেই? মোটেও না। পক্ষে প্রমাণ না থাকাটা কখনোই বিপক্ষকে প্রমাণ করেনা। অর্থাৎ দুটি গ্রহের মধ্যে একটি চায়ের কাপ থাকার যে প্রমাণ নেই এই বিষয়টি 'চায়ের কাপ' আসলেই নেই এটাকে প্রমাণ করেনা। আরও কিছুটা বুঝতে নেগেটিভ ক্লেইম নিয়ে কথা বলা যাক। আমরা কি নেগেটিভ কে প্রমাণ করতে পারি? অর্থাৎ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই এই বিষয়টিকে কি প্রমাণ করা সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। কিভাবে? বলছি।

২. 'অনস্তিত্বের প্রমাণ'

নেগেটিভ কোনো দাবি কিংবা প্রপোজিশনকে প্রমাণ যায়। যেমন ধরুন, কেউ কেউ মনে করতে পারে যে ইউনিকর্নের অস্তিত্ব আছে। এখন কেউ যদি এই দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ নাও দিতে পারে তবেই কিন্তু এটা প্রমাণ হয়না যে ইউনিকর্নের অস্তিত্ব নেই বরং 'ইউনিকর্ন এর অস্তিত্ব নেই ' এটি আলাদা একটি উপসংহার যার জন্য আমাদের এক্সট্রা, অতিরিক্ত কিছু প্রমাণ প্রয়োজন এই উপসংহার কে সত্য প্রমাণ করতে। (৩) আবার ধরুন, আমরা একটি রাজপ্রাসাদে অবস্থান করছি এবং আমরা সর্বোচ্চ স্তরে আছি। এখন আমি উপস্থিত জনগণের সামনে বললাম ' বাইরে ঝড় উঠেছে' আমার এই দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারলাম না, এতে কিন্তু আমার দাবিটি ভুল প্রমাণিত হলো না বরং কেউ যদি প্রাসাদ থেকে বের হয়ে বাইরের পরিবেশ দেখে তাহলে কিন্তু আমার দাবিটি ভুল প্রমাণিত হবে। আবার ধরুন, হরহামেশাই একাংশ বিজ্ঞানীরা মাল্টিভার্স নিয়ে কথা বলেন, নানারকম তত্ত্ব সাজান, যদিও এর পক্ষে হিসেব নিকেশ করা কোনো প্রমাণ নেই, এর মানে এইনা যে 'মাল্টিভার্স' সামগ্রিক ভাবে ভুল। বরং বিজ্ঞানীরা দেখান যে প্রি বিগব্যাং ( বিগব্যাং এর পূর্বের) এর যেকোনো মডেল আপাতদৃষ্টিতে অলীক ভাবনা মাত্র, কেননা বিগব্যাং এর 'পূর্বে' বলে আদৌ কিছু আছে এমনটাই তো ক্লাসিকাল ফিজিক্সের ল ' অনুসারে অসম্ভব। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে কোনো কিছুর প্রমাণ না থাকলেই তা মিথ্যে কিংবা সত্য না বরং এর বাইরেও অতিরিক্ত প্রমাণ আবশ্যক একটি উপসংহার কিংবা দাবি কে সত্য বা মিথ্যে প্রমাণের জন্য। 

তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে? স্রষ্টার অস্তিত্বের 'প্রমাণ' নেই এর মানে এই নয় যে 'স্রষ্টার অস্তিত্বই নেই'। বরং স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই দুটোই সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। ফলে স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ না থাকা তার অস্তিত্বকে ভুল প্রমাণ বা বাতিল করেনা বরং নাস্তিকদের ঈশ্বর নেই এই দাবির পক্ষেও প্রমাণ উপস্থাপন করাটা আবশ্যক নচেৎ প্রমাণ নাই তাই নাস্তিক এই ভুল এপ্রোচ টা বাদ দিতে হবে। পক্ষে এবং বিপক্ষে যদি কারোরই প্রমাণ না থাকে তবে অজ্ঞেয়বাদ হলো সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান। আবার যদি কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ দেয় তবে এর বিপক্ষে প্রমাণ ব্যতীত কেউ নাস্তিক দাবি করাটা ভুল চিন্তা, সুতরাং উভয় অর্থেই অজ্ঞেয়বাদ সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক। আর যেহেতু মহাবিশ্ব ডিজাইন করা এবং প্যাটার্ন আমাদের মধ্যে প্রিডিসপোজড অর্থাৎ সহজাত সেক্ষেত্রে নাস্তিকতার তুলনায় অজ্ঞেয়বাদ সর্বদাই বেশি যৌক্তিক যতক্ষণ অবধি কেউ প্রমাণ না পায়। 


রেফারেন্স: 

১. Cargile, James (January 1997). "On the burden of proof". Philosophy. Cambridge University Press. 72 (279): 59–83.

২. Hitchens, Christopher (6 April 2009). God Is Not Great: How Religion Poisons Everything (Kindle ed.). Twelve Books. p. 258. 

 ৩. Hales, Steven D. (Summer 2005). "Thinking tools: You can prove a negative" (PDF). Think. Cambridge University Press. 4 (10): 109–112.

Comments

Popular

ইনফিনিট রিগ্রেস - অসীমের দিকে প্রত্যাবর্তন